ফ্রান্সের ইতিহাসে নেপোলিয়ন বোনাপোর্ট এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। তার হাত ধরেই ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়। একজন সাধারণ গোলান্দাজ থেকে শাসকের চেয়ারে আসীন হন নেপোলিয়ন। তবে ফরাসি জনগণের চোখের মণি হলেও বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশার চোখে খুব বেশি সম্মানের ছিলেন না। বিশেষ করে ওই সময়কার সুইডেনের রাজা চতুর্থ গুস্তাভ অ্যাডলফ তাকে ভীষণ অপছন্দ করতেন। ফরাসি বিপ্লবই মূলত এই অপছন্দের হেতু। এরপর তো দুদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ফ্র্যাঙ্কা-সুইডিশ যুদ্ধ বাধে। দীর্ঘ সময় ফরাসির সৈনিকদের সঙ্গে সুইডিশ ভাইকিংদের (সামরিক যোদ্ধা) যুদ্ধ হয়।
নেপোলিয়নীয় যুদ্ধ দীর্ঘকাল দুদেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছিল। তবে দুইশ বছরের পুরোনো সেই ঘটনা এখন ইতিহাসের অংশ। ইউরোপের দুই পরাশক্তির মধ্যে এখন চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান। তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক যতই মধুর হোক, ফুটবল ময়দানে আজ কিন্তু সেই পুরোনো ফ্র্যাঙ্কো-সুইডিশ যুদ্ধের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই জায়ান্ট। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির দৃষ্টিনন্দন মেট লাইফ স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার রাত ৩টায় (১ জুলাই বুধবার, বাংলাদেশ সময়) মাঠে নামবে তারা। নকআউটের এই ম্যাচ জিতলে বিশ্বকাপের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে। ৩২-এর বাধা পেরিয়ে উঠে আসবে শেষ ১৬ তে। দুদলেরই লক্ষ্য ম্যাচ জিতে পরবর্তী রাউন্ডে ওঠা।
ফ্র্যাঙ্কো-সুইডিশ যুদ্ধ কিংবা ৩০ বছরের যুদ্ধসহ আর কয়েকটি যুদ্ধে কখনো ফ্রান্স, আবার কখনো সুইডেনের পাল্লা ভারী থাকলেও ফুটবল ময়দানে কিন্তু পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে ফ্রান্স। সেটা দুদলের পরিসংখ্যানে চোখ রাখলেই হিসাব পেয়ে যাবেন। বিশ্বকাপে প্রথমবার মাঠে নামলেও দুদল কিন্তু বেশ কিছু ম্যাচ পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলেছে। সেখানে ২৩ ম্যাচে ১২ জয় ফরাসিদের, সুইডেনের জয় কেবল ৬টি। বাকি ৫ ম্যাচ ড্রয়ে নিষ্পত্তি হয়েছে। ম্যাচের হিসাবেই শুধু নয়, র্যাঙ্কিংয়েও দুদলের আকাশ-পাতাল বিভেদ। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ফ্রান্সের অবস্থান ৩ নম্বরে, সুইডেনের অবস্থান ৩৮।
ফুটবলে দুদেশের লড়াইয়ের ইতিহাস প্রায় শতবছরের। তবে সাফল্যে ফ্রান্সের চেয়ে বেশ পিছিয়ে সুইডেন। বিশ্ব আসরে দুবার চ্যাম্পিয়নের রেকর্ড রয়েছে ফরাসিদের। ১৯৯৮ ও ২০১৮ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তারা। এ ছাড়া ২০০৬ ও ২০২২ সালে রানার্স আপ হওয়ার কীর্তিও গড়েছে দলটি। সুইডেনের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ইতিহাস না থাকলেও ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের কাছে হেরে রানার্স আপ হয়েছিল। এ ছাড়া ১৯৫০ ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থানে থেকে আসর শেষ করেছিল। সুইডেন ফুটবলের যত সাফল্য তা কেবল বিংশ শতাব্দীতেই। একবিংশ শতকে দলটি ধারাবাহিকতার ছাপ রাখতে পারেনি।
ফেবারিট হিসেবেই আজ সুইডেনের বিপক্ষে মাঠে নামবে ফ্রান্স। চলতি আসরে দলটির পারফরম্যান্স তাদের সেই মর্যাদা দিয়েছে। কোনো ম্যাচ না হেরে পূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ অব ৪৮ থেকে রাউন্ড ৩২-এ পা রেখেছে দিদিয়ের দেশমের দল। সেনেগালের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের জয়ের পর, ইরাককে ৩-০ এবং সময়ের সেরা শক্তি নরওয়েকে ৪-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়েছে লা ব্লুজরা। অন্যদিকে সুইডেন গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন কিংবা রানার্স আপ কোনোটাই হতে পারেনি। গ্রুপের তৃতীয় সেরা দল হিসেবে রাউন্ড ৩২-এর টিকেট কেটেছে গ্রাহাম পটারের শিষ্যরা। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে বড় জয়ে বিশ্বকাপ শুরু করা দলটি (৫-১), পরে নেদারল্যান্ডসের কাছে হারে ৫-১ গোলে হেরেছে। সবশেষ ম্যাচে জাপানের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে উঠে আসে পরের রাউন্ডে।
চতুর্থবারের মতো ফরাসিদের কোচের ভূমিকায় আছেন দেশম। অধিনায়ক হিসেবে সময়ের সেরা ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপে। দারুণ ছন্দে আছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক। নিয়মিত গোল পাচ্ছেন। হ্যাটট্রিকম্যান উসমান দেম্বেলে, এনগোলা কন্তে, রায়ান চারকি, ইব্রাহিমো কোনাতেরাও দলের জয়ে ভূমিকা কম-বেশি রেখে চলেছেন। সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচে আজ যে তাদের পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে থাকবে সমর্থকরা, সেটা মুখে না বললেও অনুমেয়। অন্যদিকে সুইডেনের আক্রমণে ভরসা ভিক্টর গিয়োকেরেস, আলেকজান্ডার ইসাক, অ্যান্থনি ইলাঙ্গারা। মিডফিল্ডে ইয়াসিন আয়রি, ম্যাতিয়াস সভানবার্গরা তো রয়েছেনই বলের জোগান দিতে। রক্ষণে আছেন অধিনায়ক ভিক্টর লিন্ডেলফ, গ্যাব্রিয়েল গুডমুন্ডসনের মতো পরীক্ষিত সৈনিকরা।
সব মিলে ফরাসিদের গতিময় আক্রমণের সঙ্গে সুইডেনের জমাট রক্ষণের এক ধ্রুপদী লড়াইয়ে প্রত্যাশা সবার। আজ ফরাসি দুর্গে ফাটল ধরাতে পারবে তো ভাইকিং সৈন্যরা।