বিশ্বকাপ শুরুর আগে পর্তুগাল নিয়ে যতটা উচ্ছ্বাস ছিল, গ্রুপপর্ব শেষে সেই দলটি ঘিরে এখন ঠিক ততটাই উদ্বেগ। তারকায় ঠাসা স্কোয়াড, অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয় আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নেতৃত্ব। সব মিলিয়ে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখেছিল ইউরোপের এই দলটি। কিন্তু তিন ম্যাচ শেষে তাদের পারফরম্যান্সে নেই কোনো চ্যাম্পিয়নসুলভ ছাপ বরং মাঠের খেলায় বারবার ফুটে উঠেছে অস্থিরতা, সৃজনশীলতার অভাব এবং একজন খেলোয়াড়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার চিত্র। ফলে নকআউটে উঠলেও পর্তুগাল নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই।
গ্রুপপর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে হোঁচট খায় পর্তুগাল। তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র দলটির আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা দেয়। এরপর উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০ গোলের দাপুটে জয় দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, প্রথম ম্যাচের ভুল শুধরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে রোনালদোর দল। কিন্তু শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার বিপক্ষে আবারও দেখা গেল সেই পুরোনো সমস্যাগুলো।
গোলশূন্য ড্র হওয়া ম্যাচটিতে বেশিরভাগ সময়ই চাপে ছিল পর্তুগাল। বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের সংখ্যা এবং পরিষ্কার সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে ছিল কলম্বিয়া। দক্ষিণ আমেরিকার দলটি একের পর এক আক্রমণে ব্যস্ত রেখেছিল পর্তুগিজ রক্ষণভাগকে। শেষ দিকে ডেভিনসন সানচেজের হেড জালে জড়িয়েও গিয়েছিল। কিন্তু ভিডিও সহকারী রেফারির সিদ্ধান্তে খুব সামান্য ব্যবধানে অফসাইড হওয়ায় রক্ষা পায় পর্তুগাল। গোলটি বৈধ হলে গ্রুপপর্ব শেষ করতে হতো হার দিয়ে।
এই ম্যাচের পর সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছেন অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পর্তুগালের জনপ্রিয় ক্রীড়া দৈনিক ‘আ বোলা’ তাকে ম্যাচের সবচেয়ে হতাশাজনক খেলোয়াড় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংবাদমাধ্যমটি ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বিবেচনায় তাকে ১০-এর মধ্যে মাত্র ৪ রেটিং দিয়েছে।
তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ম্যাচে রোনালদো প্রায় অদৃশ্য ছিলেন। আক্রমণে তার প্রভাব ছিল সীমিত, নেওয়া শটগুলোও খুব বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেনি। গোলরক্ষক কামিলো ভার্গাসের মুখোমুখি হয়ে পাওয়া একটি বড় সুযোগও কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন তিনি। যদিও পরে সেই আক্রমণ অফসাইড হিসেবে বাতিল হয়।
এবারের বিশ্বকাপে তিন ম্যাচের মধ্যে এটিই দ্বিতীয়বার, যখন প্রত্যাশার ধারেকাছেও যেতে পারেননি রোনালদো। কেবল উজবেকিস্তানের বিপক্ষে নিজের জাত চিনিয়েছেন তিনি। গোল করে ক্যামেরার সামনে এসে চিৎকার করে বলেছিলেন, আই এম ব্যাক। সেই ম্যাচে জোড়া গোল করে দলকে বড় জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু বাকি দুই ম্যাচে তাকে দেখে মনে হয়নি তিনি এখনও দলের প্রধান ভরসা।
তবে কলম্বিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালকে হার থেকে বাঁচানোর নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা। ‘আ বোলা’ তাকে ৮ রেটিং দিয়ে ম্যাচসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত করেছে। পুরো ম্যাচে অসাধারণ কয়েকটি সেভ করেছেন তিনি। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে হুয়ান কুইন্তেরোর ক্রস থেকে লুইস সুয়ারেজের সামনে তৈরি হওয়া সুযোগটি পা বাড়িয়ে রুখে দেওয়া ছিল ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।
দলের এমন নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স নিয়ে মুখ খুলেছেন পর্তুগালের সাবেক তারকা রিকার্ডো কারেজমাও। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বর্তমান পর্তুগাল দলটিকে দেখে মনে হচ্ছে তারা আনন্দ নিয়েই খেলছে না। কারেজমার ভাষায়, আমার মনে হয় দলটার মধ্যে প্রাণ নেই। তারা খেলাটা উপভোগ করছে না। নতুন কিছু করার চেষ্টা করছে না। সবকিছু খুব যান্ত্রিক মনে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ওদের দেখে ক্লান্ত মনে হচ্ছে। জয়ের ক্ষুধা বা লড়াই করার মানসিকতাও চোখে পড়ছে না। যেন সবাই শুধু শেখানো পরিকল্পনাটাই বাস্তবায়ন করতে মাঠে নেমেছে।
রোনালদোকে নিয়েও বাস্তবতার কথা বলেছেন সাবেক এই উইঙ্গার। ‘ক্রিশ্চিয়ানোর বয়স বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আগের মতো প্রতি ম্যাচে তাকে পাওয়া যাবে না। এখন দলের অন্যদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এখনও যদি সব দায়িত্ব তার কাঁধে তুলে দেওয়া হয়, তা হলে সেটা পর্তুগালের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে।’
গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে শেষ করায় নিজেদের নকআউটের পথ আরও কঠিন করে ফেলেছে পর্তুগাল। শেষ ৩২-এ তাদের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া, যারা ২০১৮ বিশ্বকাপের রানার্সআপ এবং ২০২২ সালের সেমিফাইনালিস্ট। সেই কঠিন পরীক্ষা পেরোতে পারলেও সামনে অপেক্ষা করতে পারে স্পেনের মতো আরেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।
শিরোপার স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে পর্তুগালকে দ্রুত নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ছন্দ ফিরে পেতে হবে। কারণ গ্রুপপর্বের পারফরম্যান্স বলে দিচ্ছে, শুধু রোনালদোর নাম কিংবা অতীতের সাফল্য দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা যায় না। মাঠে তার প্রমাণ দিতে না পারলে ফেবারিটের তকমা নিয়েই সময়ের আগেই বিদায় নিতে হতে পারে পর্তুগালকে।
সময়ের আলো/আরবিএন