ত্রিশালে শিশু ধর্ষণ: দুই ইমামের নেই শিক্ষা সনদ, নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

সারাদেশ

ময়মনসিংহের ত্রিশালে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে (২০ জুন-২২ জুন) শিশু ধর্ষণের অভিযোগে দুটি পৃথক মসজিদের দুই ইমাম গ্রেফতারের ঘটনায় নতুন

2026-06-30T19:50:25+00:00
2026-06-30T19:50:25+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
সারাদেশ
ত্রিশালে শিশু ধর্ষণ: দুই ইমামের নেই শিক্ষা সনদ, নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ৭:৫০ পিএম 
অভিযুক্ত দুই ইমাম বা থেকে শাহিনুর ইসলাম ও ডানে ইব্রাহিম। ছবি : সংগৃহীত
ময়মনসিংহের ত্রিশালে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে (২০ জুন-২২ জুন) শিশু ধর্ষণের অভিযোগে দুটি পৃথক মসজিদের দুই ইমাম গ্রেফতারের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে অভিযুক্তদের অতীত জীবন, পরিচয় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ ও যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেফতার হওয়া দুই ইমামের কেউই কোনো স্বীকৃত ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেননি বলে স্থানীয়দের দাবি। এ ঘটনায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ইমাম নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, চরিত্র ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের দাবি জোরালো হয়েছে।

সচেতন সমাজের প্রতিনিধি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের মতে, মসজিদ পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীল ভূমিকার অভাবে অনেক সময় যোগ্যতা যাচাই না হওয়া ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দায়িত্বে আসীন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই স্থানীয় সুপারিশের ভিত্তিতে ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয়।

তাদের মতে, মসজিদ কমিটিতে দায়িত্বশীল, সৎ ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন, শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করা এবং অভিযোগ উঠলে দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়োগকারী কমিটির জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত দুজনের একজনের বিরুদ্ধে অতীতেও আচরণগত অভিযোগ ছিল। অন্যজনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও এলাকায় বিভিন্ন আলোচনা ছিল।

পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া শাহিনুর ইসলাম (৪৫)-এর বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের বেলুয়া গ্রামে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে পরিচিত এক ধর্মীয় শিক্ষকের কাছে কোরআন-হাদিস ও ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। কয়েক বছর তাবলিগ জামাতের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর ধর্মীয় পোশাক ধারণ করে এলাকায় ফিরে আসেন এবং নিজেকে আহলে হাদিস মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে পরবর্তীতে ইমামতি শুরু করেন।

বিষয়টির সত্যতা স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল হাই নিশ্চিত করেছেন।

অপর শিশু ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার হওয়া মো. ইব্রাহিমকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ মন্তব্য করেছেন ত্রিশালের আলেম মুফতি আতিকুর রহমান নোমানী।

তিনি দাবি করেন, ইব্রাহিম একটি সম্মানিত আলেম পরিবারের সদস্য হলেও নিজে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। আলেমদের লেবাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে অনেক বিয়ে করেছে। তালাক হয়েছে, গন্ডগোল হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, প্রায় ১৫ বছর আগে প্রতিবেশী এক পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছিল।

ইব্রাহিমের একাধিক বিয়ের বিষয়টি স্থানীয় ইউপি সদস্য দুলাল মিয়াও নিশ্চিত করেছেন।


স্থানীয় শিক্ষক, সমাজকর্মী, আইনজীবী ও অভিভাবকদের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং অভিযোগ উঠলে দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে অভিযুক্ত শাহিনুর ইসলামের বাবা বলেন, এর আগে আমার ছেলের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এক মসজিদ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, আমি অসুস্থতার কারণে গত এক বছর ধরে ঢাকায় অবস্থান করছি। শাহিনুর ইসলামের নিয়োগের সময় স্থানীয়ভাবে তার সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণাই পেয়েছিলাম। পরে তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠবে, তা কল্পনাও করিনি। অভিযোগের বিষয়টি জানার পর আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করেছি। ভবিষ্যতে ইমাম নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, চরিত্র ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।

ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর আহাম্মদ বলেন, দুটি পৃথক ঘটনায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে তদন্ত চলছে। নির্যাতনের মতো ঘটনায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

সচেতন মহলের ভাষ্য, অপরাধীর পরিচয়, পোশাক বা সামাজিক অবস্থান নয় অপরাধই মূল বিষয়। তাদের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা, মানুষের আস্থা এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যক্তি অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক জবাবদিহি, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

পুলিশ জানিয়েছে, দুটি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের রায়ের মাধ্যমেই অভিযুক্তদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারিত হবে।

সময়ের আলো/আতা


  বিষয়:   ত্রিশাল  শিশু  ধর্ষণ  ইমাম  শিক্ষা  সনদ  নিয়োগ  ময়মনসিংহ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: