২০১৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত যে চারটি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে মাত্র চারটি দল প্রতিটি আসরের নকআউট পর্বে পৌঁছেছে। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল তো প্রত্যাশিত নাম; সাম্প্রতিক সময়ে পরাশক্তি হয়ে ওঠা ফ্রান্সও রয়েছে এই তালিকায়। তবে শেষ নামটি শুনলে হয়তো চমকে উঠতেই পারেন! কে-ই বা ভেবেছিল সুইজারল্যান্ডের নামও থাকবে এখানে? কিন্তু তারাও আছে এই তালিকায়।
ইতালিকে দেখা যায়নি গত তিনটি বিশ্বকাপে। জার্মানি তো এবার কোনোমতে নকআউটে উঠেছিল, তবে আগের দুটি বিশ্বকাপেই তারা বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকে। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড কিংবা স্পেনও পারেনি, উরুগুয়ে ব্যর্থ হয়েছে ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপে। অথচ সুইজারল্যান্ড টানা শেষ চারটি বিশ্বকাপেই নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে! হয়তো এটি বড় কোনো অর্জন নয়, তবে তাদের ধারাবাহিকতারই প্রমাণ।
মুদ্রার এপিঠে যেমন প্রতিটি বিশ্বকাপে তারা নকআউটে পৌঁছে গেছে, ওপিঠে আছে তাদের হতাশার গল্প। কারণ একবারও জয়ের দেখা পায়নি তারা। ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হার ছিল ১-০ গোলে। ২০১৮ সালে সুইডেনের কাছে হেরেছিল একই ব্যবধানে। আর ২০২২ সালে পর্তুগাল তাদের ৬-১ গোলে উড়িয়ে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই এবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে কিছুটা দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে তাদের।
ইতিহাস থেকে চাইলে কি স্বস্তিও খুঁজে নিতে পারে তারা? কিন্তু কীভাবে? প্রতিবার তো বিদায় হয়েছিল শেষ ষোলোতে। এবার তো পরের ম্যাচ খেলবে শেষ ৩২-এ। সমস্যা হচ্ছে, ইতিহাস স্রেফ পরিসংখ্যান। জয়ের জন্য চাই ভালো খেলা, ইতিহাস তো আর খেলতে নামবে না। কারণ ইতিহাস যদি খেলতেই নামত, তবে এর মধ্যেই জয়টি সুইসদের নামের পাশে লেখা হয়ে যেত। যেই ইতিহাস তাদের পক্ষে ও বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আছে, সেই একই ইতিহাস বলছে দুটি দেশের মধ্যে আগে যে দুইবার দেখা হয়েছিল, সেখানে দুইবারই বিজয়ী দলের নাম ছিল সুইজারল্যান্ড।
আলজেরিয়াকে অবশ্য খুব বেশি ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ আপাতত নেই। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-০ গোলের হার দিয়ে বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু করেছিল তারা। সেই ম্যাচের পর অনেকেই তাদের গ্রুপ পর্বেই বিদায় দেখেছিলেন। তবে সবাইকে ভুল প্রমাণ করে জর্ডানের বিপক্ষে জয় এবং অস্ট্রিয়ার সঙ্গে নাটকীয় ড্রয়ের পর এখন তারাও পা রেখেছে শেষ ৩২-এ। বিশ্বকাপের আগে শেষ চার ম্যাচে যারা প্রতিপক্ষের জালে ১২টি গোল দিয়েছিল, আর্জেন্টিনার কাছে হারের পর যারা দুই ম্যাচে ৫ গোল করতে পারে, তাদের আক্রমণ যে সুইসদের জন্য মাথাব্যথার কারণ হবে, তা অনেকটাই অনুমেয়।
ম্যাচটি মূলত সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্সের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার আক্রমণের লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্তত বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে যেভাবে তারা খেলেছে, তাতে লড়াইটিও এমনভাবেই প্রত্যাশিত। দুদলই গ্রুপ পর্বে ক্লিনশিটের মুখ দেখেনি। তবে শেষ দুই ম্যাচে ৫ গোল করা আলজেরিয়া যেন আবারও জানিয়ে দিয়েছে, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গোল না পাওয়া ছিল কেবল একটি দুর্ঘটনা। এর আগে ও পরে ৬ ম্যাচে ১৭টি গোল করেছে তারা। আলজেরিয়ার সবচেয়ে বড় ভরসার নাম রিয়াদ মাহারেজ। তার ফর্মে ফেরা দলের জন্যও বড় স্বস্তি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। এবারই প্রথম বিশ্বকাপে গোলের দেখা পেলেন এই তারকা খেলোয়াড়। এর আগে জর্ডানের বিপক্ষে জয়ে একটি অ্যাসিস্টও করেছিলেন তিনি।
এদিকে চলতি বিশ্বকাপেই সুইজারল্যান্ড খুঁজে পেয়েছে নতুন তারকা, যার নাম জোহান মানজাম্বি। ২০ বছর বয়সি এই ফুটবলার চলতি আসরে ৩টি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট নিয়ে এখন সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের আলোচনায়। কানাডার বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেন তিনি, আর বসনিয়ার বিপক্ষে করেন দুটি গোল।
টুর্নামেন্টের শুরুতে যাকে খেলানো নিয়েই দ্বিধা ছিল, তিনিই এখন দলের মূল ভরসা। এই ম্যাচে আলজেরিয়ার জন্য হারানোর কিছু নেই। র্যাঙ্কিং বিবেচনায় তারা সুইজারল্যান্ডের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে, তার ওপর তারা নকআউটে সুযোগ পেয়েছে গ্রুপের তৃতীয় দল হিসেবে। অতীতের বিশ্বকাপ হলে হয়তো তাদের বিদায়ই হয়ে যেত, তবে নতুন ফরম্যাটের বিশ্বকাপে বদলে গেছে তাদের ভাগ্য।
সুইজারল্যান্ডের লক্ষ্য যখন নকআউটে টানা হারের গেরো খুলে ফেলা, তখন আলজেরিয়া চাইবে নিজেদের ইতিহাস সমৃদ্ধ করতে। শেষবার তারা নকআউটে পৌঁছেছিল ২০১৪ বিশ্বকাপে রাউন্ড অব সিক্সটিনে; সেবার জার্মানিকে ‘প্রায় হারিয়েই’ দিয়েছিল। তবে এবার ‘প্রায়’ বাদ দিয়ে সরাসরি হারিয়ে দিতে চাইবে তারা। অন্যদিকে সুইসদের লক্ষ্য থাকবে নকআউটে টানা হারের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা।
সময়ের আলো/আআ