মানবসভ্যতার অস্তিত্ব, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং পৃথিবীর সৌন্দর্য বর্ধনে বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। গাছ কেবল মানুষের খাদ্য, অক্সিজেন ও আশ্রয়ের উৎস নয়, বরং এটি প্রাকৃতিক নিরাপত্তার প্রধান ঢাল। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের প্রেক্ষাপটে বৃক্ষরোপণ একটি সময়ের দাবি।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে কেবল আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা দেয়নি, বরং প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণেও রয়েছে এর সুনির্দিষ্ট ও কালজয়ী নির্দেশনা। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তায়ালা উদ্ভিদ ও বৃক্ষরাজির কথা উল্লেখ করে এগুলোকে তাঁর মহান নিয়ামত হিসেবে অভিহিত করেছেন। সুরা আল-আনআমের ৯৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন; অতঃপর আমি তা দ্বারা সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি।’
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বৃক্ষ আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ দান, যা সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। এ ছাড়া সুরা আর-রহমানের ১০ নম্বর আয়াতে পৃথিবীকে মানুষের জন্য উপযোগী করার কথা বলা হয়েছে। এই উপযোগিতা বজায় রাখার জন্য পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষরোপণ অপরিহার্য। আবার সুরা আল-আরাফের ৫৬ নম্বর আয়াতে পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে। পরিবেশ ধ্বংস ও নির্বিচারে বৃক্ষনিধন করা যে এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত তা ইসলামের আলোকে স্পষ্ট।
হাদিসের পাতায় পাতায় বৃক্ষরোপণের ফজিলত ও গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে অথবা কোনো ফসল উৎপাদন করে, তারপর তা থেকে মানুষ, পাখি কিংবা প্রাণী আহার করে- তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়’ (বুখারি)। এই হাদিসটি বৃক্ষরোপণকে এক চলমান সদকা বা সদকায়ে জারিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার সওয়াব গাছটি যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন রোপণকারীর আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে।
বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়ও তোমাদের কারও হাতে একটি চারা গাছ থাকে এবং তা রোপণ করার সুযোগ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে। এই অমীয় শিক্ষা আমাদের শেখায় যে, কোনো পরিস্থিতিতেই পরিবেশের কল্যাণ সাধন থেকে বিরত থাকা উচিত নয়।
ইসলামের ইতিহাসে প্রকৃতি সংরক্ষণের অনন্য দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। রাসুলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধাবস্থায়ও অপ্রয়োজনে গাছ কাটতে নিষেধ করেছেন। আজকের পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বনভূমি ধ্বংসের সংকটে এই শিক্ষাগুলো আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা। বৃক্ষরোপণকে এখন কেবল ব্যক্তিগত আমল হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
ইসলামে বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষার উপায় নয়, বরং এটি ইবাদত ও মানব কল্যাণের একটি মহৎ মাধ্যম। একটি গাছ রোপণ করা হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার। আসুন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও প্রিয় জন্মভূমিকে সবুজে সাজাতে আমরা বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ করি।
লেখক : প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম
সসময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও