চলমান বিশ্বকাপে মাঠের ভেতরে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো মহাতারকাদের পাশে উচ্চারিত হচ্ছে হ্যারি কেনের নাম। নকআউট পর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কঙ্গোর বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও এই ইংলিশ অধিনায়কের জোড়া গোলেই শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে ইংল্যান্ড। মাঠের সেই জাদুকরী পারফরম্যান্সে যখন পুরো গ্যালারি মেতেছে কেন-উল্লাসে, ঠিক তখনই মাঠের বাইরে আলো কাড়ছে তার জীবনের এক শান্ত, মধুর ও নিভৃত রূপকথা। ফুটবলীয় উন্মাদনার আড়ালে থাকা সেই গল্পটি আর কিছু নয়, স্ত্রী কেটি গুডল্যান্ডের সঙ্গে তার চিরসবুজ প্রেমকাহিনী।
পূর্ব লন্ডনের স্কুলজীবনের সেই চপল বন্ধুত্ব কীভাবে সময়ের পরিক্রমায় আজীবনের এক নিটোল বন্ধনে এবং একটি সুখী পরিবারে রূপ নিল, তা যেকোনো রোমান্টিক উপন্যাসকেও হার মানায়।
হ্যারি কেন ও কেটি গুডল্যান্ডের প্রথম দেখার গল্পটা বেশ পুরোনো। পূর্ব লন্ডনের লার্কসউড প্রাইমারি স্কুলে যখন তাদের পরিচয় হয়, তখন কেনের বয়স মোটে বারো আর কেটি এগারো বছরের এক কিশোরী। দিনটি ছিল ২০০৫ সালের; ফুটবল কিংবদন্তি ডেভিড বেকহ্যাম যখন তাদের চিংফোর্ড ফাউন্ডেশন স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন, তখন এই দুই খুদে শিক্ষার্থীর সাথে একটি ফ্রেমে বন্দি হয়েছিলেন তিনি। কে জানত, বেকহ্যামের দুই পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা সেই দুই শিশুই একদিন বাস্তব জীবনের জুটি হবেন! স্কুলের সেই সোনালি দিনগুলোতেই তাদের বন্ধুত্ব ডালপালা মেলতে শুরু করে। এরপর হাই স্কুলের পাঠ চুকিয়ে ২০১২ সাল থেকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ডেটিং শুরু করেন।
তারকাখ্যাতির জোয়ারে ভেসে যাওয়ার পর সম্পর্কের ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, তা নিয়ে কেন সবসময়ই বেশ অকপট। তার মতে, বিপুল খ্যাতির পর কে কেবল অর্থের লোভে পাশে আসছে আর কে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার টানে মিশছে, তা চেনা বড্ড কঠিন। আর এখানেই নিজেকে পরম ভাগ্যবান মনে করেন ইংলিশ ফরোয়ার্ড। হ্যারি কেনের ভাষায়, ‘আমি সত্যিই ভাগ্যবান যে ছোটবেলার ভালোবাসাকেই আমি জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি। ও আমার পুরো ক্যারিয়ারকে একদম কাছ থেকে দেখেছে।’
১৯৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া কেটি গুডল্যান্ড কেবল কেনের স্ত্রী পরিচয়েই সীমাবদ্ধ নন। স্কুলজীবনের পড়ালেখা শেষ করে তিনি লন্ডনের মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১৪ সালে স্পোর্টস সায়েন্সে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি একজন সফল পেশাদার ফিটনেস কোচ ও ট্রেনার হিসেবে কাজ করছেন। ২০১৭ সালে বাহামা দ্বীপে ছুটি কাটানোর এক রোমান্টিক মুহূর্তে এই জুটির বাগদান সম্পন্ন হয়। এরপর ২০১৯ সালের এক মনোরম গ্রীষ্মে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে কেটিকে নিজের ‘সেরা বন্ধু’ ও ‘সোলমেট’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন কেন।
সংসার আলো করে আসা চার সন্তানের কোলাহলে মুখর এই দম্পতির সুখী গৃহকোণ। আইভি জেন, ভিভিয়েন জেন, লুই হ্যারি এবং হেনরি এডওয়ার্ড নামের চার সন্তানকে নিয়ে তাদের ভরা সংসার। মাঠের বাইরে কেটির নিজস্ব স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সবসময় সমীহ করেন কেন। ইংলিশ অধিনায়কের অকপট স্বীকারোক্তি-পরিবারের সমর্থন আর কেটির কঠোর পরিশ্রমই তাকে বিশ্ব ফুটবলের এই সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে এবং শত খ্যাতির মাঝেও সবসময় মাটির কাছাকাছি থাকতে সাহায্য করেছে।
লার্কসউড প্রাইমারি স্কুলের সেই ছোট্টবেলার খেলার সাথি থেকে আজ জীবনের পরম সঙ্গী-কেন ও কেটির এই পথচলা যেন এক জীবন্ত দলিল যে, বিশ্বজোড়া খ্যাতির প্রবল চাপের মুখেও সত্যিকারের নিখাদ ভালোবাসা টিকে থাকে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড যখন বিশ্বসেরা হওয়ার তীব্র লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে কেটি গুডল্যান্ডের হাতের হাত রেখে কাটানো জীবনটাই হয়তো হ্যারি কেনের জীবনের সবচেয়ে বড় এবং মধুরতম জয়।