বিশ্বকাপ শুধু ট্রফির লড়াই নয়, এটি নতুন নক্ষত্রেরও জন্ম দেয়। প্রতি আসরেই এমন কিছু ফুটবলার আলোচনায় উঠে আসেন, যাদের নাম টুর্নামেন্ট শুরুর আগে খুব বেশি উচ্চারিত হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেমনই এক সম্ভাবনার নাম মালিক টিলম্যান।
ইউরোপের ফুটবল সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার এখন আমেরিকান ফুটবলের নতুন প্রজন্মের প্রতীক। তার পায়ে যেমন সৃজনশীলতার ছাপ, তেমনি রয়েছে বড় ম্যাচের চাপ সামলে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য। ক্লাব ফুটবলে তিনি বর্তমানে জার্মানির শক্তিশালী ক্লাব বায়ার লেভারকুজেনের হয়ে খেলছেন, যেখানে ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় নিজেকে আরও পরিণত করে তুলছেন।
মালিক টিলম্যানের পরিচয় শুধু একজন ফুটবলার হিসেবে নয়, দুটি সংস্কৃতির মেলবন্ধনের প্রতীক হিসেবেও। আমেরিকান বাবা ও জার্মান মায়ের সন্তান হওয়ায় জন্ম থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি দুই দেশের নাগরিক। জার্মানিতেই তার বেড়ে ওঠা, সেখানেই ফুটবলের হাতেখড়ি। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে তিনি জার্মানির জার্সিতে খেলেছেন, তাই অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন একদিন জার্মানির সিনিয়র দলেই দেখা যাবে তাকে।
কারণ সেটিই তো অধিকাংশ তরুণ ফুটবলারের স্বপ্ন। যে দেশের জার্সিতে একসময় খেলেছেন অসংখ্য কিংবদন্তি, এখনও যেখানে ম্যানুয়েল নয়্যার, কাই হাভার্টজ ও জামাল মুসিয়ালাদের মতো তারকারা প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই জার্সি গায়ে মাঠে নামার সুযোগ খুব কম খেলোয়াড়ই ফিরিয়ে দেন। কিন্তু টিলম্যান ছিলেন ব্যতিক্রম। জার্মানির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অংশ হওয়ার সুযোগ ছেড়ে তিনি বেছে নেন যুক্তরাষ্ট্রকে। তার বিশ্বাস ছিল, নতুন প্রজন্মের এই মার্কিন দলকে বিশ্বমঞ্চে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অভিযানের অংশ হওয়াই হবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন। সেই সিদ্ধান্তই আজ তাকে বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম নির্ভরতার জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
টিলম্যানের ফুটবল-জীবনের ভিত গড়ে ওঠে পরিবারের মধ্যেই। তার বড় ভাই টিমোথি টিলম্যানও একজন পেশাদার ফুটবলার। দুই ভাইয়ের প্রথম ঠিকানা ছিল গ্রয়টার ফ্যুর্থের একাডেমি। সেখান থেকে প্রতিভার
স্বীকৃতি হিসেবে সুযোগ পান বায়ার্ন মিউনিখের বিখ্যাত যুব একাডেমিতে। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল একাডেমিতে কাটানো সময়ই মালিককে শিখিয়েছে কীভাবে বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে হয়, কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং কীভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাতেই আজ তিনি বায়ার লেভারকুজেনের মতো শীর্ষ পর্যায়ের ক্লাবে নিয়মিত নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন।
মাঠে টিলম্যানের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার বহুমুখীতা। তিনি শুধু আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার নন, প্রয়োজন হলে উইং, সেন্ট্রাল মিডফিল্ড কিংবা ‘ফলস নাইন’ হিসেবেও খেলতে পারেন। বল পায়ে আত্মবিশ্বাস, নিখুঁত ড্রিবলিং, দূরপাল্লার শট এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেদ করে সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা তাকে আধুনিক ফুটবলের পরিপূর্ণ মিডফিল্ডারে পরিণত করেছে। তাই বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় অস্ত্র হতে পারেন তিনিই।
২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু নকআউট পর্বে ওঠা নয় বরং আরও অনেক দূর যাওয়ার। সেই লক্ষ্য পূরণে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। টিলম্যানের দায়িত্বও তাই অনেক বড়। তিনি যেমন আক্রমণের সূচনা করেন, তেমনি প্রয়োজন হলে নিচে নেমে বল কাড়ার কাজও করেন। ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ, খালি জায়গা খুঁজে বের করা এবং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করা। সব মিলিয়ে দলের কৌশলগত পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপ এমন এক মঞ্চ, যেখানে একটি মুহূর্তই একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার বদলে দিতে পারে। একটি নিখুঁত পাস, একটি গোল কিংবা একটি অসাধারণ পারফরম্যান্স একজন খেলোয়াড়কে রাতারাতি বিশ্ব তারকায় পরিণত করতে পারে। টিলম্যানও সেই সুযোগের অপেক্ষায়। ইউরোপীয় ফুটবলের শৃঙ্খলা, আমেরিকান মানসিকতা এবং বায়ার লেভারকুজেনে খেলে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়েই তিনি এখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের ছাপ রাখতে চান।
যদি যুক্তরাষ্ট্র এবারের বিশ্বকাপে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো কিছু করতে পারে, তবে সেই গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে মালিক টিলম্যানের। কারণ তিনি শুধু একজন প্রতিভাবান ফুটবলার নন বরং নতুন প্রজন্মের যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলের প্রতিচ্ছবি। দুই দেশের শিকড়, ইউরোপের শিক্ষা, বায়ার লেভারকুজেনের অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বকাপের স্বপ্ন। সব মিলিয়ে মালিক টিলম্যান এখন এমন এক নাম, যার দিকে তাকিয়ে রয়েছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।
সময়ের আলো/আআ