দুটি ভিন্ন মহাদেশ, ভিন্ন পথ, ফুটবল দর্শনও বেশ ভিন্ন; তবে লক্ষ্যটা দুপক্ষেরই এক- জয় নিয়ে পা রাখতে হবে শেষ ষোলোতে। এমন দুটি দল যখন মাঠে নামে, তখন আলোচনায় উঠে আসে অনেক বিষয়। জাপানের বিদায়ের পর এখন এশিয়ার দল বলতে শুধু অস্ট্রেলিয়াই টিকে রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই হয়তো এশিয়ান সমর্থকদের বড় অংশ চোখ রাখবে ক্যাঙ্গারুদের দিকেই। মনে উঁকি দিতে পারে একটি প্রশ্ন অস্ট্রেলিয়া তো নিজেই একটি মহাদেশ, তারা কীভাবে এশিয়ার দল হয়? মূলত ওশেনিয়ার অন্তর্ভুক্ত হলেও, তারা এএফসির সদস্য।
বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ার জন্য ওশেনিয়া মহাদেশের দলগুলোকে প্লে-অফে বড় বড় দেশের সঙ্গে খেলতে হতো, যার কারণে বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া অস্ট্রেলিয়ার জন্য বেশ কঠিন ছিল। আর সে কারণেই তো ২০০৬ বিশ্বকাপের প্লে-অফে উরুগুয়েকে হারিয়ে তারা এশিয়ায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর থেকেই এএফসির সদস্য তারা। এই সিদ্ধান্তও বেশ কাজে দেয় ক্যাঙ্গারুদের জন্য। কারণ এরপর অনুষ্ঠিত হওয়া পাঁচ আসরে তারা একটি বিশ্বকাপও মিস করেনি।
তবে উদ্দেশ্য তো শুধু অংশ নেওয়ায় সীমাবদ্ধ নয় অস্ট্রেলিয়ার জন্য, সামনের দিকেও তো এগিয়ে যেতে হবে তাদের। ২০০৬ এবং ২০২২ এই দুটি বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে পা রেখেছিল অস্ট্রেলিয়া, তবে এরপরই তাদের বাড়ি ফেরার টিকেট কেটে দেয় ইতালি ও আর্জেন্টিনা। দুবারই এক গোলের ব্যবধানে হারতে হয়েছিল তাদের। আধুনিক ফরম্যাটে এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউটে পা রেখেছে মিসর। এখন দলটির একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য- ঢেউয়ে ভাসাতে হবে ক্যাঙ্গারুর স্বপ্ন কিংবা মরুর রাজাদের কাছে নত করাতে হবে ক্যাঙ্গারুর লাফ। কাব্যিক ভাষায় যাই হোক, মাঠের ফলাফলে মোহাম্মদ সালাহদের অন্তত একটি গোল বেশি দেওয়াই লক্ষ্য। একই চাওয়া থাকবে অস্ট্রেলিয়ারও।
আরও একটা জায়গায় অবশ্য মিলও আছে তাদের উচ্চতায় কেউই কারও চেয়ে কম নয়। অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়দের গড় উচ্চতা যেখানে ১৮৩.৬ সেন্টিমিটার, সেখানে মিসরের খেলোয়াড়দের গড় উচ্চতা ১৮১.২ সেন্টিমিটার। উচ্চতায় যেমন প্রায় সমানে সমান, পরিসংখ্যানেও কিন্তু একই অবস্থা। দুদলের মধ্যে দেখা হয়েছে মাত্র দুবার; তাতে একটি জয় অস্ট্রেলিয়ার, অপরটি মিসরের। সবশেষ ২০১০ সালের লড়াইয়ে মিসর জয় তুলে নেয় ৩-০ ব্যবধানে। উচ্চতায়, মুখোমুখি লড়াইয়েও যেমন সমানে সমান, তেমনি ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও তাদের অবস্থান প্রায় একই। অস্ট্রেলিয়া যেখানে ২৭ নম্বরে, মিসরের অবস্থান তখন ২৯। হয়তো শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে এই ম্যাচ নিয়ে খুব বেশি আলোচনায় নেই, তবে দুদলের পাল্লা দিয়ে চলা পরিসংখ্যান বলে দেয়, এই ম্যাচটি হতে পারে একটি ‘বিশ্বকাপ ক্লাসিক’ ম্যাচ।
অস্ট্রেলিয়া ও মিসরের মাঝে পার্থক্য গড়ে দাঁড়াতে পারেন মোহাম্মদ সালাহ, যিনি মিসরের রাজা হিসেবেও পরিচিত। নিঃসন্দেহে এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় তারকা তিনি। ৩৪ বছর বয়সি এই ফুটবলারের জন্য এটি হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ; নিজেও চাইবেন বড় মঞ্চে শেষবারের মতো নিজেকে প্রমাণ করে যেতে। এখন পর্যন্ত মিসরের সেরা খেলোয়াড়ের মতোই খেলছেন তিনি। তিন ম্যাচে দুটি অ্যাসিস্ট ও একটি গোল এসেছে তার কাছ থেকে। নিউজিল্যান্ডকে হারানো এবং বেলজিয়ামের সঙ্গে ড্র করায়ও তার বেশ অবদান ছিল। মিসরের সমর্থকরা এবার তার জাদু দেখতে চাইবে আরেকবার।
অস্ট্রেলিয়ার এই দলটি বেশ তরুণ। তাদের শক্তির মূল জায়গা ডিফেন্স আর এটাই তো সবচেয়ে বড় ভরসা। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন যেমন বলেছেন, আক্রমণ ম্যাচ জেতায়, রক্ষণ ট্রফি জেতায়। গ্রুপপর্বে মাত্র দুটি গোল করলেও রানারআপ হয়ে নকআউটে এসেছে তারা, কারণ তারা হজমও করেছে মাত্র দুটি গোল। বলাই যায়, তাদের রক্ষণ ভাঙতে বেশ চেষ্টা করতে হবে মিসরকে।
তুলনামূলকভাবে মিসরের আক্রমণ একটু বেশি শক্তিশালী। মোহাম্মদ সালাহ দলে থাকার সুবিধা কাজে লাগিয়েই গ্রুপপর্বে পাঁচটি গোল তুলে নিয়েছে তারা। তবে গ্রুপপর্বের সব ম্যাচেই গোল হজম করেছে দলটি। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া শেষ দুটি ম্যাচে কোনো গোল পায়নি। দুর্বল ডিফেন্সের কারণে প্রতি ম্যাচেই বেশ কিছু শটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা আহমেদকে, তবে দারুণ দক্ষতায় তিনি বেশ কিছু বল রুখে দিয়েছেন।
৭৫ শতাংশ শট রুখে দিচ্ছেন তিনি; এখন পর্যন্ত তার সেভের সংখ্যা ৯টি। সব মিলিয়ে বলা যায়, দুদলের লড়াই হবে সমানে সমান। আজ রাত ১২টায় ডালাসে মুখোমুখি হবে মিসর ও অস্ট্রেলিয়া। ৩৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা ও প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের সামনে শেষ হাসি হাসবে কারা-মিসরের ফারাওরা নাকি অস্ট্রেলিয়ার ক্যাঙ্গারুরা?
সময়ের আলো/আআ