বিশ্বকাপের নকআউট মানেই নতুন গল্পের জন্ম। এখানে অতীতের সাফল্য কিংবা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের হিসাব মুহূর্তেই মুছে যেতে পারে একটি ভুলে, একটি গোলেই বদলে যেতে পারে পুরো ভাগ্য। একদিকে দক্ষিণ আমেরিকার ছন্দময় ফুটবলের প্রতীক কলম্বিয়া, অন্যদিকে আফ্রিকার অদম্য লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি ঘানা।
কানসাস সিটির সবুজ গালিচায় বাাংলাদেশ সময় শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় মুখোমুখি হবে এই দুই দল। জয়ী দল জায়গা করে নেবে শেষ ষোলোতে, যেখানে অপেক্ষায় থাকবে সুইজারল্যান্ড অথবা আলজেরিয়া। আর পরের ধাপ পেরোতে পারলে সামনে দেখা মিলতে পারে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। তাই এই ম্যাচটি কেবল নকআউটের আরেকটি লড়াই নয়, বরং স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার এক কঠিন পরীক্ষাও দুদলের।
গ্রুপ পর্বে নিজেদের অন্যতম সেরা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে কলম্বিয়া। ‘কে’ গ্রুপে তিন ম্যাচে সাত পয়েন্ট নিয়ে তারা শীর্ষস্থান দখল করে নকআউটে উঠেছে। উজবেকিস্তানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করা নেস্তর লরেঞ্জোর দল এরপর ডিআর কঙ্গোকে ১-০ গোলে পরাজিত করে। শেষ ম্যাচে পর্তুগালের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। তিন ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করা কলম্বিয়ার রক্ষণভাগ এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা।
অন্যদিকে ঘানার পথ ছিল অনেক বেশি বন্ধুর। ‘এল’ গ্রুপে পানামাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শুভসূচনা করলেও দ্বিতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে মূল্যবান এক পয়েন্ট তুলে নেয় ব্ল্যাক স্টার্সরা। শেষ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-১ ব্যবধানে হারলেও চার পয়েন্ট নিয়ে সেরা তৃতীয় দলগুলোর একটি হিসেবে শেষ ৩২ নিশ্চিত করে কার্লোস কুইরোজের শিষ্যরা। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে রেখে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, বড় দলের জন্য কতটা কঠিন প্রতিপক্ষ হতে পারে।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও ব্যবধান স্পষ্ট। সর্বশেষ প্রকাশিত র্যাঙ্কিংয়ে কলম্বিয়ার অবস্থান ১৩ নম্বরে, আর ঘানা রয়েছে ৭৩ নম্বরে। তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে র্যাঙ্কিংয়ের গুরুত্ব অনেক সময়ই হারিয়ে যায়। ইতিহাস বলছে, বড় দলকে চমকে দেওয়ার ক্ষমতা ঘানার রয়েছে। বিশ্বকাপের অতীতও দুই দলের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ২০১৪ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল এবং ২০১৮ সালে শেষ ষোলো খেলেছিল কলম্বিয়া। যদিও ২০২২ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি তারা। এবার আবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্ত অবস্থান ফিরে পাওয়ার পথে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।
অন্যদিকে আফ্রিকার অন্যতম সফল বিশ্বকাপ দল ঘানা। ২০০৬ সালে শেষ ষোলো এবং ২০১০ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল ব্ল্যাক স্টার্সরা। সেই স্মৃতিকে অনুপ্রেরণা করেই আবারও বড় চমকের অপেক্ষায় তারা। দুই দলের প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎও হতে যাচ্ছে এই ম্যাচে। ফলে কানসাস সিটির মাঠে শুধু একটি দলই পরের রাউন্ডে যাবে না, ইতিহাসের পাতায়ও যুক্ত হবে নতুন অধ্যায়। কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় ভরসা লুইস দিয়াজ। তার গতি, ড্রিবলিং ও গোল করার সামর্থ্য যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। মাঝমাঠে রিচার্ড রিওসের নিয়ন্ত্রণ এবং ড্যানিয়েল মুনিওসের আক্রমণাত্মক ওভারল্যাপও হতে পারে বড় অস্ত্র। আক্রমণভাগে অভিজ্ঞ হ্যামেস রদ্রিগেজ ও লুইস সুয়ারেজও প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি।
ঘানার হয়ে নজর থাকবে জর্ডান আয়ুর দিকে। জাতীয় দলের হয়ে ৩৪ গোল করা এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ডই নেতৃত্ব দেবেন আক্রমণভাগে। মাঝমাঠে মোহাম্মদ কুদুসের সৃজনশীলতা এবং অঁতোয়ান সেমেনিয়োর গতি কলম্বিয়ার রক্ষণে চাপ তৈরি করতে পারে। ইনজুরির দিক থেকে অনেকটাই স্বস্তিতে রয়েছে কলম্বিয়া।
পর্তুগালের বিপক্ষে লুইস সুয়ারেজ সামান্য শারীরিক সমস্যার কারণে বদলি হিসেবে খেললেও তিনি এখন পুরোপুরি ফিট এবং শুরুর একাদশে ফেরার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে পূর্ণশক্তির দল নিয়েই মাঠে নামতে পারবেন কোচ নেস্তর লরেঞ্জো। ঘানার শিবিরে অবশ্য কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। ফরোয়ার্ড অঁতোয়ান সেমেনিয়ো গোড়ালির চোটে ভুগছিলেন। তবে ম্যাচের শুরু থেকেই খেলতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। গোলরক্ষক লরেন্স আতি-জিগির ফিটনেস নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি শেষ পর্যন্ত খেলতে না পারলে আবারও গোলবারের নিচে দেখা যেতে পারে বেঞ্জামিন আসারেকে।
ম্যাচের আগে আত্মবিশ্বাসী দুই কোচই। কলম্বিয়ার কোচ নেস্তর লরেঞ্জো জানিয়েছেন, গ্রুপ পর্বে যে সংগঠিত ও আক্রমণাত্মক ফুটবল তার দল খেলেছে, নকআউটেও সেই ধারা বজায় রাখতে চান। ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজের জন্য ম্যাচটি বিশেষ আবেগের। একসময় তিনিই কলম্বিয়ার দায়িত্বে ছিলেন। তবে অতীতকে পেছনে রেখে এখন তার একমাত্র লক্ষ্য ঘানাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া। অধিনায়ক জর্ডান আয়ুও বলেছেন, দেশের মানুষের জন্য স্মরণীয় কিছু করতে তারা নিজেদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেবেন।
কৌশলগত দিক থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখতে চাইবে কলম্বিয়া। লুইস দিয়াজ, হামেস রদ্রিগেজ ও লুইস সুয়ারেজকে ঘিরেই সাজবে তাদের আক্রমণ। অন্যদিকে ঘানা অপেক্ষা করবে প্রতিপক্ষের ভুলের জন্য এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক ও সেট-পিস থেকে সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।
সব পরিসংখ্যান, বর্তমান ফর্ম এবং দলগত ভারসাম্য কলম্বিয়ার পক্ষেই কথা বলছে। তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব এমন এক মঞ্চ, যেখানে পূর্বাভাস অনেক সময় বাস্তবতার কাছে হার মানে। ২০১০ সালে বিশ্বকে চমকে দেওয়া ঘানা আবারও নতুন ইতিহাস লিখতে চায়, আর কলম্বিয়ার লক্ষ্য দীর্ঘদিন পর বিশ্বকাপে আরও গভীরে যাওয়া। তাই কানসাস সিটির এই লড়াই হতে যাচ্ছে অভিজ্ঞতা, কৌশল, সাহস ও স্বপ্নের এক রুদ্ধশ্বাস সংঘর্ষ।
সময়ের আলো/আআ