ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজাকে কেন্দ্র করে গত ৫ দিনে পর্দার আড়ালে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র- এমন দাবি করেছে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশকে জানাজায় অংশ না নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ ও নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করেছে মার্কিন প্রশাসন।
এক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে তাসনিম জানায়, এই প্রচারণা সর্বোচ্চ পর্যায়ে সমন্বয় করা হয়। এতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতরা জড়িত ছিলেন।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, কোনো দেশ খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিনিধিদল পাঠালে তাদের উন্নয়ন সহায়তা কমিয়ে বা স্থগিত করা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
তাসনিমের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ জুন রুবিও একটি গোপন নির্দেশনা জারি করে বিশ্বের সব মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনকে স্বাগতিক দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগের নির্দেশ দেন।
নির্দেশনায় বলা হয়, জানাজায় অংশগ্রহণকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ‘অবন্ধুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পড়তে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই আরব কূটনীতিকের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রুবিও ব্যক্তিগতভাবে অন্তত ৫ টি আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতরা আরও কঠোর অবস্থান নেন বলেও দাবি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তেহরানে প্রতিনিধি পাঠালে উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
মার্কিন এই কূটনৈতিক চাপের ফলে অন্তত ১৩টি দেশ শেষ পর্যন্ত জানাজায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ায় বলে দাবি করেছে তাসনিম। এর মধ্যে ৩ টি পূর্ব ইউরোপীয় দেশ, ৫ টি আফ্রিকান রাষ্ট্র, ২ টি পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশ এবং পূর্ব এশিয়ার ২ টি গুরুত্বপূর্ণ দেশ রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এসব দেশের কয়েকটি জেনেভা ও নিউইয়র্কে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করে তাদের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেয়। অন্য কয়েকটি দেশ তেহরানে অবস্থানরত নিম্নপদস্থ কূটনীতিকদের অনুষ্ঠানে পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও ইরান তা গ্রহণ করেনি।
তবে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সত্ত্বেও ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি জানাজা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন বলে তাসনিমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, এটি খামেনির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্মান এবং মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ব্যর্থতার প্রতিফলন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে তেহরানে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির মরদেহ রাখা হবে। পরে তাকে দাফনের জন্য পবিত্র ইমাম রেজার মাজারসংলগ্ন মাশহাদে নেওয়া হবে।
এদিকে, জানাজার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে যেকোনও ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানি কর্মকর্তারা।
প্রসঙ্গত, জেনেভায় আলোচনা চলাকালে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথবাহিনী। এতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এর প্রতিবাদে পরবর্তী ৩৯ দিনে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ১০০ দফা হামলা চালায় ইরান। এরপর ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় ১৩ এপ্রিল হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপ করা হয়। পরে কয়েক দফায় যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ানো হয়।
সর্বশেষ, ইরানের ১৪ দফা শর্তের ভিত্তিতে ১৪ জুন ভার্চুয়ালি একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে দুই পক্ষ।
অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ দফার ভিত্তিতে উভয় পক্ষ ৬০ দিনের জন্য আলোচনায় সম্মত হয়েছে এবং ইরানের ওপর হামলা বন্ধের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের লিগ্যাল মেডিসিন সংস্থার তথ্যমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘাতে মোট ৩ হাজার ৩৭৫ জন নিহত হন। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী। এ ছাড়া জরুরি চিকিৎসা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ১১৮ জন চিকিৎসাকর্মী আহত এবং ২৬ জন নিহত হন।
সময়ের আলো/মহু