প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, কতটা এগিয়েছে জাকসু?

হাবিবুর রহমান সাগর

শিক্ষা

দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল এক নতুন আশাবাদ।

2026-07-04T18:56:49+00:00
2026-07-04T18:56:49+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা
প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, কতটা এগিয়েছে জাকসু?
হাবিবুর রহমান সাগর
প্রকাশ: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৬ পিএম 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল এক নতুন আশাবাদ। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় ১০ মাস পর প্রশ্ন উঠছে- জাকসু কতটা সফল হয়েছে? নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? শিক্ষার্থীরা কি তাদের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, দলীয় বা লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, বাস্তবে জাকসু কি তা ধরে রাখতে পেরেছে?

অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, প্রশাসনিক ও শিক্ষার্থীসেবামূলক কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্যানেলের প্রকাশিত ইশতেহারে ছিল পরিবহন সংকট নিরসন, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, গবেষণা সহায়তা বৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক বিকাশ, শিক্ষার্থী কল্যাণসহ নানা উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি।

প্রত্যাশার নির্বাচনের পর বাস্তবতার পরীক্ষা
গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনে ২৫টি পদের মধ্যে ২০টিতে বিজয়ী হয় ছাত্রশিবির-সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট। তাদের প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য ছিল '৫ ইয়েস'। যেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত ডাইনিং ব্যবস্থা, পরিবহন সংকট নিরসন, প্রশাসনিক অটোমেশন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।


অন্যদিকে, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের নেতৃত্বে নির্বাচিত বর্তমান ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুও ইশতেহারে একাধিক সংস্কারমূলক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। সেখানে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, খাতা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ, গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, স্মার্ট আইডি কার্ড, ফ্রি ওয়াই-ফাই, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধা এবং শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল গঠনের অঙ্গীকার ছিল।

নির্বাচনের পর শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল, এসব প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাকসু কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ছাত্র সংসদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটা?
১০ মাসে জাকসুর কিছু কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের নজরে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে- কয়েকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসবের আয়োজন, দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ কর্মশালা, বটতলায় ওয়াশরুম স্থাপনের উদ্যোগ, কিছু সড়ক প্রশস্তকরণ ও ফুটপাত নির্মাণসংক্রান্ত অনুমোদন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাফেটেরিয়ায় তিন বেলা খাবার সরবরাহ চালুর উদ্যোগে সমন্বয়।

এসব উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মতে, এগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া বড় প্রতিশ্রুতিগুলোর তুলনায় সীমিত অর্জন।

যেসব প্রতিশ্রুতি এখনও অপূর্ণ
জাকসুর সবচেয়ে আলোচিত প্রতিশ্রুতিগুলোর অনেকগুলোই এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। পরিবহন সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি, নতুন বাস ও রুট ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি, ডাইনিং ভর্তুকি কার্যকর হয়নি, ডিজিটাল কুপন ব্যবস্থা চালু হয়নি এবং স্বাস্থ্যবীমাও চালু হয়নি।


এ ছাড়া, আধুনিক ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠা হয়নি, ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা যায়নি, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো গড়ে ওঠেনি, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু হয়নি, খাতা পুনর্মূল্যায়নের নীতিমালাও প্রণীত হয়নি।

গবেষণা অনুদান ও বৃত্তি বৃদ্ধির দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া প্রশিক্ষক নিয়োগ বাস্তবায়িত হয়নি, স্মার্ট আইডি কার্ড চালু হয়নি, ক্যাম্পাসজুড়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই লাগলেও এর কোনো যথাযথ ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশনও এখনও আংশিক পর্যায়ে রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও হতাশার মিশ্র চিত্র
শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, নির্বাচনের সময় যেভাবে উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।

গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আল আমিন বলেন, ‘নির্বাচনের আগে মনে হয়েছিল, জাকসু আমাদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর হবে। কিন্তু এতদিন পর এসে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই এখনও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।’

অনেক শিক্ষার্থীর মতে, ছাত্র সংসদের কার্যক্রম এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক। অথচ শিক্ষার্থীদের প্রধান চাহিদা ছিল পরিবহন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও একাডেমিক সংস্কারের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর সমাধান।

তবে আরেকটি অংশের শিক্ষার্থীরা মনে করেন, মাত্র ১০ মাসে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় লাগতেই পারে।

পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। ক্যাম্পাসের জন্য ইকোলজিক্যাল মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কথাও বলা হয়। কিন্তু সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।


তাদের মতে, পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এমন সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক। একইভাবে ক্যাম্পাসে উচ্চক্ষমতার কৃত্রিম আলোর ব্যবহার অতিথি পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে।

যদিও জাকসুর পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সম্পাদক শাফায়াত মীর জানান, লেক ইজারা বন্ধ এবং পরিবেশবান্ধব আলোকব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ মাস্টারপ্ল্যানে পরিবেশগত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কাজও চলছে।

লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্যানেল বিশেষ করে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অন্যদিকে, সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটও শিক্ষার্থীকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিল। তবে, গত ১০ মাসে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ইস্যুতে জাকসুর অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

একাংশের অভিযোগ, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ছাত্র সংসদের অবস্থান দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাবমুক্ত বলে মনে হয়নি। প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্তে তারা প্রত্যাশিত দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। বরং, কিছুদিন পূর্বে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদান করেছেন।

অন্যদিকে জাকসুর নেতাদের দাবি, তারা দলীয় পরিচয়ের বাইরে থেকে শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই কাজ করছেন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

তবে, এ অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে, লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্নটি এখনও বিতর্কের বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে।

প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাও বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহারের অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য বড় অঙ্কের বাজেট, সিন্ডিকেটের অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।’


তাদের মতে, ‘অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষমতা এককভাবে জাকসুর হাতে নেই। ফলে, বাস্তবতার সঙ্গে ইশতেহারের কিছু অঙ্গীকারের সামঞ্জস্য শুরু থেকেই প্রশ্নের মুখে ছিল।’

জাকসুর পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক সাফায়েত মীর বলেন, ‘আমরা জাকসু থেকে চেষ্টা করেছি আমাদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করার, কিন্তু প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার কারণে এখনও আমাদের অনেক প্রতিশ্রুতি বাকি রয়েছে। বিশেষ করে অটোমেশন এখনও আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি । তবে, আমার ব্যক্তিগত যেই ইশতেহার ছিল- লেক সংস্কার এবং লেক খননের বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে বারবার কথা বলেছি, কিন্তু প্রশাসনের কাছ থেকে সেই পরিমাণ সহযোগিতা আমি পাইনি।’

জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ইশতেহারের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে এবং আরও কিছু উদ্যোগ চলমান রয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে বাকি প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।’

অন্যদিকে, ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   প্রতিশ্রুতি  বাস্তবতা  শিক্ষার্থী  প্রত্যাশা  জাকসু  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: