পরগাছার রাজত্ব, সংকটে সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’

বাগেরহাট প্রতিনিধি

সারাদেশ

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রাণ এবং নামের উৎস ‘সুন্দরী’ গাছ এখন এক মহাবিপর্যয়ের মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির

2026-07-06T17:27:37+00:00
2026-07-06T19:00:42+00:00
 
  সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬,
২২ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
পরগাছার রাজত্ব, সংকটে সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’
বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৫:২৭ পিএম 
সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ গাছে পরগছার আক্রমণ। ছবি : সময়ের আলো
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রাণ এবং নামের উৎস ‘সুন্দরী’ গাছ এখন এক মহাবিপর্যয়ের মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি এবার নতুন আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে পরগাছার আক্রমণ। বন বিভাগের তথ্যমতে, সুন্দরবনের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছই এখন এই ক্ষতিকর পরজীবীর আক্রমণে জর্জরিত। আগে এই পরগাছা কেবল গাছের ডালপালায় সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে তা সুন্দরী গাছের মূল কাণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পুষ্টিহীনতায় ভুগে দ্রুত দুর্বল হয়ে মারা যাচ্ছে গাছগুলো।

বিশেষজ্ঞ ও বন বিভাগ সতর্ক করে জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে আগামী এক-দুই দশকের মধ্যে সুন্দরবনের অস্তিত্বের প্রতীক সুন্দরী গাছ চরম বিলুপ্তির সংকটে পড়বে। যার মারাত্মক প্রভাব পড়বে বনের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর।

এক সময় সুন্দরবনের প্রধান উদ্ভিদ প্রজাতি ছিল সুন্দরী গাছ। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, অতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং দীর্ঘদিনের ‘আগামরা’ রোগের কারণে এই গাছের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমছে। এর ওপর নতুন করে পরগাছার এই তীব্র বিস্তার সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিপুলসংখ্যক সুন্দরী গাছে এই পরগাছার আক্রমণ ঘটেছে। এই পরজীবী উদ্ভিদগুলো মূলত সুন্দরী গাছের শরীর থেকে খাদ্য ও রস শোষণ করে বেঁচে থাকে। এর ফলে আক্রান্ত গাছের পাতার রঙ প্রথমে বিবর্ণ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে গাছ থেকে সব পাতা ঝরে পড়তে থাকে। একপর্যায়ে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি থমকে যায় এবং পুরো গাছটি শুকিয়ে মারা যায়। 

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরস্রোতা ‘ভোলা নদী’র প্রায় ১৬ কিলোমিটার অংশ পলি পড়ে সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। নদীটি ভরাট হওয়ায় বনের ভেতরের অসংখ্য শাখা-খালে জোয়ার-ভাটার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বনের ভেতরের লবণাক্ততা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে, যা সুন্দরী গাছের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং পরগাছা ও ছত্রাকের আক্রমণকে আরও সহজ করে তুলছে।


সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল উপকূলের ১০ লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা এখন চরম ঝুঁকিতে। বন থেকে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, মধু ও মোম সংগ্রহ, গোলপাতা কাটা এবং পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মানুষরা ইতোমধ্যেই এই পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব টের পেতে শুরু করেছেন।

স্থানীয় মৌয়াল ও জেলেরা জানিয়েছেন, বনে সুন্দরী গাছ শুকিয়ে যাওয়ার কারণে মৌমাছির চাক আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে, যার ফলে মধুর উৎপাদন কমছে। একই সঙ্গে বনের নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের পরিমাণও কমে গেছে। ফলে বনের পণ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা তাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিন ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে সুন্দরী গাছে আগামরা রোগ ও ক্ষতিকর পরগাছার বিস্তার বাড়ছে। সুন্দরী গাছের সংখ্যা এভাবে কমতে থাকলে সুন্দরবনের পুরো ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সংকট উত্তরণে দ্রুত গভীর গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট লোনাপানি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ড. মো. লতিফুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের ভেতরের নদী-খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের বিচরণক্ষেত্র ও প্রজননস্থল সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এর ওপর বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার এবং অতিমাত্রায় মৎস্য আহরণের ফলে বনের নদ-নদীতে মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। যেহেতু সুন্দরবনে অন্য পেশাজীবীদের চেয়ে জেলের সংখ্যা বেশি, তাই মাছ কমে গেলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকা হারানোর শঙ্কা সবচেয়ে বেশি।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, আগামরা রোগের পর সুন্দরী গাছের জন্য এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ক্ষতিকর পরগাছা। শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ গাছে এর আক্রমণ আমরা শনাক্ত করেছি। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়া ভোলা নদীর বাকি অংশ পুনরায় খনন করার একটি মহাপরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরী গাছ শুধু একটি সাধারণ বৃক্ষ নয়, এটি সুন্দরবনের অস্তিত্বের রক্ষাকবচ। নদী-খাল ভরাট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় বনটি এমনিতেই নাজুক, তার ওপর পরগাছার এই নতুন আক্রমণ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সুন্দরী গাছ হারিয়ে গেলে শুধু বনের ক্ষতি হবে না, বরং পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্য এবং লাখ লাখ মানুষের জীবন সম্পূর্ণ বিপন্ন হয়ে পড়বে।

সময়ের আলো/জোই




  বিষয়:   সুন্দরবন  সংকটে  সুন্দরী  পরগাছার  গাছ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: