মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের খাঁজে ও ঢালুতে বসবাস করছে মানুষ। ছবি : সময়ের আলো
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় টানা ৩ দিন ধরে চলছে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ। বৃষ্টির কারণে পাহাড়গুলোর মাটি দুর্বল হয়ে পড়ায় সীতাকুণ্ডের ছোট-বড় টিলাগুলোতে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে স্থানীয়দের মনে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আবহাওয়া অধিদফতর চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় অতি ভারী বৃষ্টি এবং পাহাড় ধসের আশঙ্কার কথা জানিয়ে দেশের চার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ বশির আহমেদ জানান, অতি ভারী বৃষ্টির কারণে যেকোনও মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর, সোনাইছড়ি, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, বারৈয়াঢালা, লতিফপুর, ছোট দারোগারহাট ও বাড়বকুণ্ড আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ের খাঁজে ও ঢালুতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ চরম মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। এদের অধিকাংশ দিনমজুর, রিকশাচালক ও পোশাক কারখানার শ্রমিক। অতীতে ২০১৭ সালের ২১ জুলাই সীতাকুণ্ডে পাহাড় ধসে তিন শিশুসহ ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর স্মৃতি এখনও স্থানীয়দের তাড়া করে ফিরলেও, এবার বর্ষার শুরু থেকে প্রশাসনের মাইকিং, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত বা উচ্ছেদ অভিযানের মতো চিরচেনা তৎপরতা চোখে পড়েনি।
পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলেছে প্রশাসন। ছবি : সময়ের আলো
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অন্যান্য বছর বর্ষা এলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং ও আশ্রয়কেন্দ্র খোলার হিড়িক পড়ত, কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত তেমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তবে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, সলিমপুরের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অন্তত ১০০টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার রয়েছে, যাদেরকে সরে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পরিবারগুলোকে সরানোর জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তাদের থাকার জন্য সমতলের এসএম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুনও জানান, মাইকিং করা হলেও অনেকেই বসতঘর ছেড়ে যেতে চাইছেন না।
নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারের মতে, ‘শুধু অতিবৃষ্টি নয়, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কাটা ও অবৈধ দখলের কারণেই এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। শুধু দুর্যোগের পর মাইকিং না করে, স্থায়ীভাবে অবৈধ দখল বন্ধ করা জরুরি।’
এদিকে, সীতাকুণ্ডের এই চরম ঝুঁকির পেছনে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট ও শিল্প গ্রুপের বেপরোয়া পাহাড় কাটাকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। মহাসড়কের ভাটিয়ারী-হাটহাজারী লিংক রোডে একটি শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে এক্সক্যাভেটর দিয়ে গণহারে পাহাড় কাটা এবং পাহাড়ি ছড়া ভরাট করে রাস্তা, ইটভাটা ও কারখানা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
সীতাকুণ্ড ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, শত শত বছরের দৃশ্যমান পাহাড়ের ৮ একর জায়গাকে অনিয়মের মাধ্যমে কাগজ-কলমে 'ভূমি' শ্রেণিতে রূপান্তর করে ইট তৈরির আয়োজন চলছে। এতে ঝরনা-ছড়া শুকিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
এছাড়া, বাড়বকুণ্ড উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের পাশেও দেদারসে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে সিন্ডিকেট। সম্প্রতি পুলিশ ৩টি মাটি ভর্তি ট্রাক জব্দ করেছে।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোহাম্মদ আলমগীর জানান, এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদের মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন করায় ভাটিয়ারী এলাকার কফিল ও ওয়াসিম নামে দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
আটক কফিলের স্ত্রী জেমু আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার স্বামী পাহাড় কাটার প্রতিবাদ করায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা দেওয়া হয়েছে। আমরা পাহাড় কাটা বন্ধ ও এই মিথ্যা মামলার প্রত্যাহার চাই।’
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান অবশ্য দাবি করেছেন, পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ আশরাফ জানান, এর আগে ভাটিয়ারীতে অভিযান চালিয়ে যন্ত্রপাতি জব্দসহ একজনকে জেল দেওয়া হয়েছে এবং এলাকাটি তাদের নজরদারিতে রয়েছে।
স্থানীয়দের মনে এখন একটাই প্রশ্ন- প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ কি কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনার পরই শুরু হবে? নাকি পরিবেশ ধ্বংসকারী ও পাহাড় খেকোদের থামিয়ে মানুষের জীবন বাঁচাতে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?