কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢল ও ভাঙা বেড়ি বাঁধ দিয়ে সমুদ্রের জোয়ারের পানি ঢুকে বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ছনুয়া, শেখেরখীল, নাপোড়া, চাম্বল, শীলকুপ, জলদী পৌরসভা এলাকা, প্রেমাশিয়া, কদমরসুল ও পুকুরিয়ায় অন্তত ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
সরজমিনে দেখা যায়, টানা প্রবল বর্ষণের কারণে ছনুয়া ইউনিয়নের উলুখালী, মধুখালী, আমিরপাড়া, সাম্বলী পাড়া, আলী আহমদ ও জমিলা পাড়া, আবাখালী, খুদুকখালী, টেকপাড়া, নোয়াপাড়াসহ অধিকাংশ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে এলাকার রাস্তা-ঘাট, বসতভিটা, পুকুর এবং মৎস্য প্রজেক্ট পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। ছনুয়া উপকূলের পূর্বাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার ফলে কয়েক হাজার বসতঘরে পানি প্রবেশ করায় চুলায় আগুন জ্বলেনি ওই সব ঘরে। ফলে অনাহারে দিন কাটছে অনেকের। এছাড়া ডুবে গেছে মাছের প্রজেক্ট ও গ্রামীণ রাস্তাঘাট। ফলে গ্রামীণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অভিযোগ উঠেছে পানি নিষ্কাশনের স্লুইসগেটে অসাধু ব্যক্তিরা মাছ ধরার জাল বসিয়ে পানির স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্ন ঘটার।


ছনুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাওলানা আবদুর রশিদ ছানুবী বলেন, ছনুয়ায় পর্যাপ্ত কালভার্ট ও স্লুইসগেট না থাকায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া যে কয়েকটি স্লুইসগেট রয়েছে, সেগুলোর সামনে ও পেছনে জাল বসানোর কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে পানি নিষ্কাশনে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়ে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
ছনুয়া ইউনিয়নের সমাজকর্মী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, মধুখালীর পুরো এলাকার অন্তত ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কারো চুলায় আগুন জ্বলেনি। মধুখালী-ছেলবন এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম বাঁশের সাঁকোটি ডুবে থাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনি দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
পুঁইছড়ির ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তারেকুর রহমান জানান, পাহাড়ি ঢলের কারণে নাপোড়া ও শেখেরখীলের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। ছড়ার দুই পাশের বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
তিনি জানান, পশ্চিম পুঁইছড়ির ২ নম্বর ওয়ার্ডে হারুনের দোকান সংলগ্ন ব্রিক সলিং সড়কটি ভারি বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় তিনি দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে তাৎক্ষণিক মেরামত করে দেন বলেও জানান।
শেখেরখীল ইউনিয়নের নাপোড়া-শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশের সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হিন্দুপাড়ায় বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত সড়কটি মেরামত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে গ্রামীণ সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে বাহারছড়া ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, বুদাগাজী তালুকদার বাড়ির সড়ক দিয়ে খ্যানারো বাড়ি, ফকির মোহাম্মদের বাড়ি, মল্যার বাড়ি, মল্যার নতুন বাড়ি, মাঝির বাড়ি এবং হায়দার আলী বাড়িসহ বহু মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এই সড়ক।
বর্ষাকালে রাস্তাটি কাদা ও জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়ায় শিশু, শিক্ষার্থী, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন।
স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ তালুকদার বলেন, প্রতি বছর বর্ষা এলেই আমাদের দুর্ভোগ শুরু হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো রাস্তাটি কাদায় ভরে যায়। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের চলাচল খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। জনপ্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। আমরা দ্রুত রাস্তাটি সংস্কারের দাবি জানাচ্ছি।
খানখানাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহেদুল হক বলেন, উপকূলীয় ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে সমুদ্রের জোয়ারের পানি ঢুকে ফসিল জমি ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যে কোনো সময় বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কাও করেন তিনি।
বাঁশখালী পৌরসভার বাসিন্দা উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, দক্ষিণ জলদি ও উত্তর জলদীর ২৮ টি পাহাড়ি ছড়ার পাড় ভেঙে গেছে। অনেকের ঘরবাড়ি পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। মহাজন পাড়ার কয়েকশ ঘরে ঢলের পানি ঢুকে পড়ায় তাদের রান্না-বান্না বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে।
বাঁশখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, বাঁশখালী প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশে কৃষি ক্ষেতের বেশি ক্ষতি হতে পারে। এসব এলাকা এখনও পানির নিচে। পানি নেমে যাওয়ার পর আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবো। আমাদের মাঠ কর্মকর্তারা মাঠে রয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রহুল আমিন বলেন, ভারি বর্ষণের কারণে পূর্ব বাঁশখালীর পাহাড় ধসের শঙ্কা রয়েছে। পাহাড়ি এলাকার সবাইকে সচেতন ও সাবধান থাকতে পরামর্শ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ভারি বর্ষণের সময় পাহাড় ধসে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তাই প্রাণহানি এড়াতে জলদি, চাম্বল, শীলকূপ, পুইছড়ি, বৈলছড়ি, কালীপুর, সাধনপুর ও পুকুরিয়ার পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/জোই