সৌদি আরব লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এর ফলে দেশটি এবং সম্ভব হলে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম না করেই আরও বেশি তেল পরিবহন করতে পারবে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটি ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে নির্মাণ করা হয়েছিল এবং গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এটি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল পরিবহন করতে পারে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গত মে-তে বলেছিলেন, প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পশ্চিম উপকূলের শোধনাগারগুলোতে সরবরাহ করা হয় এবং প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানির জন্য ব্যবহার করা হয়।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, পাইপলাইনের সক্ষমতা প্রতিদিন আরও ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত সম্ভাব্য বৃদ্ধির বিষয়ে সৌদি আরব তার কিছু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করছে। আরামকোর পরিকল্পিত সক্ষমতা বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন নাকি একটি নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে, তা স্পষ্ট নয়। একটি সূত্র জানিয়েছে, এই সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে পেট্রোলিয়াম বা তেলজাত পণ্যের জন্য একটি ছোট আকারের দ্বিতীয় পাইপলাইনও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
কুয়েত, বাহরাইন এবং কাতার সবারই হরমুজ প্রণালি এড়ানোর মতো বিকল্প পথের অভাব রয়েছে, অন্যদিকে বিরোধ এবং বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তুরস্কের সঙ্গে ইরাকের পাইপলাইনটি তার সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম কার্যকর রয়েছে।
কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ নওয়াফ আল-সাবাহ গত মাসে আটলান্টিক কাউন্সিল গ্লোবাল এনার্জি ফোরামে বলেছিলেন, কুয়েতের তেলের ব্যারেলগুলো সামঞ্জস্য করার জন্য আমাদের ভাই সৌদি আরব এবং আমিরাতের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান পাইপলাইনব্যবস্থা কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায় তা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, এই সম্প্রসারণ প্রতিদিন ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ ব্যারেলের জন্য হতে পারে, যেখানে পরিশোধিত তেলের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, এটি সম্পন্ন হতে কয়েক বছর সময় লাগবে, শতকোটি ডলার খরচ হবে এবং সৌদি অপরিশোধিত তেলের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকরা প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল, যার ফলে তেলের দাম অনেক বেড়ে যায়।
গত মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার একটি প্রাথমিক চুক্তির পর তেল প্রবাহ আংশিকভাবে পুনরায় শুরু হয়েছে, তবে তা যুদ্ধপূর্ব অবস্থার চেয়ে কম রয়েছে। এই উদ্ভাবন চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এবং পরীক্ষায় মৃতদেহ ও প্রাণীর প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করতে পারে।
গত মে-তে ইরাকের তেল উৎপাদন প্রতিদিন ৪৩ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ১৫ লাখ ব্যারেলেরও নিচে নেমে আসে, কুয়েত গত মার্চ মাসে চুক্তি বাস্তবায়নে তাদের অক্ষমতা বা ‘ফোর্স ম্যুর’ ঘোষণা করে এবং বাহরাইনের সিত্রা শোধনাগার বেশ কয়েকবার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়।
লন্ডনভিত্তিক হার্ডক্যাসল অ্যাডভাইজরির ব্যবস্থাপনা অংশীদার জায়েদ বেলবাগি বলেন, সৌদি আরব, কুয়েত এবং কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন পাইপলাইন করিডোর বা পথ নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা একটি বৃহত্তর কৌশলগত বাস্তবতা প্রতিফলিত করে। এই সংঘাত আঞ্চলিক দেশগুলোর মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর করার বিপদের দিকে কেন্দ্রীভূত করেছে।
আরামকো এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, অন্যদিকে সৌদি ও বাহরাইন সরকারের যোগাযোগ দফতর, ইরাকের তেল মন্ত্রণালয় এবং কাতারএনার্জি মন্তব্যের অনুরোধে অবিলম্বে কোনো সাড়া দেয়নি। তিনটি সূত্র জানিয়েছে, কাতার, যা মূলত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি করে, তারা আরও বড় প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে এবং সৌদি আরবের মধ্য দিয়ে পথসহ বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য বিকল্প বিবেচনা করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত-যাদের হরমুজ প্রণালি এড়ানোর মতো একমাত্র অর্থপূর্ণ বিকল্প সক্ষমতা রয়েছে, তারা একটি নতুন পশ্চিম-পূর্ব পাইপলাইনের অর্ধেক কাজ সম্পন্ন করেছে, যা আগামী বছর চালু হলে ফুজাইরাহ বন্দরে অপরিশোধিত তেলের সক্ষমতা দ্বিগুণ করবে। তাদের বিদ্যমান আবুধাবি পাইপলাইনটি প্রতিদিন ১৮ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল পরিবহন করে।
শিল্প খাতের একটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের এই সম্প্রসারণের উদ্যোগ ইঙ্গিত দেয় যে, যুদ্ধের পর সৌদি-আমিরাত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরবর্তী ধাপটি তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে শীর্ষে ওঠার দৌড় হতে পারে এবং ফলস্বরূপ এটি তেলের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি