ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের এই সম্মেলনে এক ডজনের বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির নানা সংকটের মধ্যে বসছে এবারের বৈঠক।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনের আয়োজক। শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রায় ৩০ হাজার অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে এবং অতিথিদের অবস্থান করা বিভিন্ন হোটেলের আশপাশের সড়কে যান চলাচল করা হয়েছে সীমিত।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) নয়াদিল্লিতে পৌঁছে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংও আজ ভারতে পৌঁছেছেন। সাত বছর পর তার ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্কের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রিকসের বর্তমান পরিধি
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার নামের আদ্যক্ষর থেকে ‘ব্রিকস’ নামটির উৎপত্তি। ২০০৬ সালে অনানুষ্ঠানিক জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি। ২০০৯ সালে প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা এতে যোগ দেয়।
২০২৩ সালে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। আর্জেন্টিনাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তবে দেশটি পরে তা প্রত্যাখ্যান করে। ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া যোগ দেওয়ার পর বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য ১১টি দেশ।
এই দেশগুলো বিশ্বের প্রায় ৪৯ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে বিকল্প সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করাই জোটটির অন্যতম বড় লক্ষ্য।
এবারের আলোচনায় অর্থনীতি ও প্রযুক্তি
ভারতের সভাপতিত্বে এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য—‘বিল্ডিং ফর রেজিলিয়েন্স, ইনোভেশন, কো-অপারেশন অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’। বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
বিশেষ করে রাশিয়া ও ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবের মধ্যে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা। রাশিয়া জানিয়েছে, ব্রিকসের অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির বিষয়েও আলোচনা করবে তারা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকস এখনই মার্কিন ডলারকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনায় যাচ্ছে না। বরং নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প পথ তৈরি করাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
এবারের সম্মেলনের অন্যতম কঠিন বিষয় ইরান যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার ছয় মাসের বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই সম্মেলন। মে মাসে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এই যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সম্মেলনে যুদ্ধের বিষয়টি তুলতে পারেন। একই সঙ্গে ইরান ও ব্রিকস সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ঐকমত্য তৈরি করাও কঠিন হতে পারে।
ভারতও এ ক্ষেত্রে জটিল অবস্থানে রয়েছে। দেশটি ইরান ও ইসরায়েল— উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ধরে রাখতে চাইছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও ব্রিকস নেতাদের আলোচনায় থাকবে। ২০২৫ সালের রিও ডি জেনেরিও ঘোষণায় ব্রিকস নেতারা রাশিয়ার সমালোচনা না করে ইউক্রেনের রাশিয়াবিরোধী হামলার নিন্দা করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আলোচনায় যুদ্ধ নিয়ে নতুন কোনো কঠোর অবস্থানের বদলে সদস্যদেশগুলোর নিজস্ব স্বার্থ কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
সম্প্রতি রাশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সফর এবং সম্ভাব্য শান্তি উদ্যোগও এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ভারত-চীন সম্পর্কেও নজর
সাত বছর পর সি চিন পিংয়ের ভারত সফর এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০২০ সালের হিমালয় সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্কে দীর্ঘদিন টানাপোড়েন ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতি হলেও সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য ঘাটতি ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদি ও সি চিন পিংয়ের বৈঠক দ্বিপক্ষীয় মতপার্থক্য কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ব্রিকসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
চীন ব্রিকসকে পশ্চিমা শক্তির পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে দেখতে আগ্রহী। অন্যদিকে ভারত এটিকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে, যেখানে পশ্চিমবিরোধী না হয়েও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা যায়।
সৌদি-হুতি সংঘাতও চ্যালেঞ্জ
ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার টানাপোড়েনও ব্রিকসের জন্য জটিলতা তৈরি করছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের জ্বালানি ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। বিপরীতে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে।
ইয়েমেনের কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথও সাম্প্রতিক সংঘাতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ফলে এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
পশ্চিমাদের জন্য কতটা উদ্বেগের?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিকসকে ‘অ্যান্টি-আমেরিকান’ শক্তি হিসেবে সমালোচনা করেছেন। তবে বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করেন, ব্রিকসকে ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, আবার কেউ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। ফলে সব আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছানো ব্রিকসের জন্য সহজ নয়।
তবু ব্রিকসের গুরুত্ব বাড়ছে। অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্য, অর্থায়ন ও কূটনীতিতে নিজেদের জন্য আরও বিকল্প তৈরি করতে চাইছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সম্মেলনের আসল পরীক্ষা হবে মতবিরোধ দূর করে ঐক্য প্রতিষ্ঠা নয়; বরং মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বাস্তব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা কতটা এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটিই।
সময়ের আলো/জেডি