টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সড়কে পানি উঠে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় কোমর থেকে গলা সমান পানি জমে থাকায় মানুষ নৌকা, ভ্যান কিংবা হেঁটে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থায় ১০ টাকার ভাড়া বেড়ে কোথাও কোথাও ১০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বান্দরবান পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিলালপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া, মেম্বারপাড়া ও লেমুঝিরিসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কোমর থেকে গলা সমান পানি জমে রয়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে, আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
জেলা শহরের বালাঘাটা এলাকায় সড়কের ওপর দিয়েই নৌকায় মানুষ পারাপার করছেন। কেউ ভ্যানে, আবার কেউ কোমরসমান পানি পেরিয়ে চলাচল করছেন। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করতে গিয়ে ১০ টাকার ভাড়ার পরিবর্তে ১০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান সদরে ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, আলীকদমে ১৫টি, লামায় ৫৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টিসহ জেলার সাত উপজেলায় মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বুধবার রাত ৮টা পর্যন্ত শুধু বান্দরবান সদরের ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৪ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে অন্যান্য উপজেলায় নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, মাতামুহুরী নদীর বিপৎসীমা ১১ দশমিক ৮০ মিটার হলেও বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত নদীটির পানি ১৩ দশমিক ৪২ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমা ১৪ দশমিক ৮০ মিটার অতিক্রম করে ১৬ মিটারে পৌঁছেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের অফিসার ইনচার্জ সনাতন কুমার মণ্ডল জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতি ভারী বৃষ্টিপাত হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া ৫ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ৯ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত ৯৬ ঘণ্টায় মোট ৭৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
বালাঘাটা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ কালাম বলেন, সাধারণ সময়ে বালাঘাটা থেকে টমটমে শহরে যেতে ১০ টাকা ভাড়া লাগলেও এখন গলা সমান পানির কারণে অর্ধেক পথ যেতে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। কয়েকদিন ধরে মানুষের যে দুর্ভোগ চলছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, ভ্যান বা নৌকার ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় কোমরসমান পানি পেরিয়ে বাজারে যেতে হচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
বালাঘাটা আমবাগানপাড়া এলাকার বাসিন্দা উমং প্রু মারমা বলেন, পরিবারের অসুস্থ সদস্যকে নিয়ে বান্দরবান সদরে যেতে হয়েছিল। কিন্তু সড়কে পানি জমে থাকায় গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগেছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে। প্রতি বছরই এ এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। সড়কের ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা হলে দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মমতা আফরিন বলেন, বন্যাকবলিত বম হোস্টেল ও ত্রিপুরা হোস্টেলের শিক্ষার্থীরা পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তাদের জন্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হয়েছে এবং অন্যান্য পানিবন্দি মানুষের কাছেও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস জানান, পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ইউএনও, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাইকিং করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে সতর্ক করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, জেলার সাতটি উপজেলায় খোলা ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করছে।
সময়ের আলো/আরবিএন