বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই বাঁচা-মরার লড়াই। নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে মিসরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শেষ আটে ওঠা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবার মুখোমুখি সুইজারল্যান্ডের। ইতিহাস, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখলেও, পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দৃঢ় রক্ষণে ভর করে চমক দেখিয়ে আসা সুইসদের হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। শেষ চারে জায়গা নিশ্চিত করতে তাই দুই দলের লড়াইয়ে জমে ওঠার সব উপাদানই রয়েছে।
বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কেপভার্দের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে কঠিন পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসার পর, কোয়ার্টার ফাইনালে এসে আর্জেন্টিনা আরও বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। মিসরের বিপক্ষে ম্যাচে নির্ধারিত সময়ের মাত্র ১১ মিনিট বাকি থাকতে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু দারুণ প্রত্যাবর্তন, সঙ্গে কয়েকটি বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্ত সব মিলিয়ে লিওনেল স্কালোনির দল ম্যাচের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেয়।
মিসরের বিপক্ষে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিওনেল মেসি এবং এনজো ফার্নান্দেজের গোলে অবিশ্বাস্যভাবে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শুরুতে পেনাল্টি মিস করা মেসি পরে গোল করে নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেন। এই নাটকীয় জয়ে আর্জেন্টাইন সমর্থকরা আবারও উচ্ছ্বাসে ভাসেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এটি ছিল আর্জেন্টিনার টানা ১২তম জয়। বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এখন আর মাত্র তিনটি জয় পেলেই আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের স্বাদ পাবে। মেসি ও তার সতীর্থদের খেলায় বয়সের কিছুটা ছাপ দেখা গেলেও, তাদের অসাধারণ দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও লড়াকু মানসিকতাই দলটিকে এতদূর নিয়ে এসেছে।
কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হারের পর থেকে বিশ্বকাপে টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে আর্জেন্টিনা। এই প্রতিটি ম্যাচেই তারা অন্তত দুটি করে গোল করেছে, যা বিশ্বকাপে তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ধারাবাহিকতা। ইতিহাসও আর্জেন্টিনার পক্ষেই কথা বলছে।
বড় টুর্নামেন্টে অর্থাৎ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের দুটি দেখাতেই জয় এসেছে। ১৯৬৬ সালে ২-০ এবং ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ১-০ ব্যবধানে। সব মিলিয়ে সাতবারের মুখোমুখি লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ড কখনোই আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারেনি, যা তাদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের কঠিনতাই স্পষ্ট করে।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড এখনও পর্যন্ত খুব বেশি চোখধাঁধানো ফুটবল না খেললেও, তারা ছিল অত্যন্ত সংগঠিত ও কার্যকর। ১৯৫৪ সালে নিজেদের মাটিতে শেষবার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর এবারই প্রথম সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখছে দলটি। মুরাত ইয়াকিনের দল বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিল স্বাগতিক কাতারের বিপক্ষে হতাশাজনক ড্র দিয়ে। এরপর তারা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ৪-১ গোলে হারায় এবং সহ-আয়োজক কানাডাকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে।
গ্রুপ ‘বি’-এর চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে ওঠার পর তারা আলজেরিয়াকে বিদায় করে এবং কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-৩ (০-০) ব্যবধানে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করে। ভ্যাঙ্কুভারে সেই টাইব্রেকারে নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল।
রক্ষণভাগকে প্রাধান্য দেওয়া বাস্তববাদী কোচ ইয়াকিনের কৌশল এখন পর্যন্ত সফল হয়েছে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বসহ পুরো টুর্নামেন্টে সুইজারল্যান্ড একবারের জন্যও পিছিয়ে পড়েনি। শেষ আটে থাকা ছয়টি ইউরোপীয় দলের একটি হিসেবে এবার তাদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ইতিহাস গড়া।
দুইবার পেনাল্টি মিস করলেও গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এখনও আট গোল নিয়ে এগিয়ে রয়েছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক এবারও দলকে নেতৃত্ব দেবেন। মেসির সঙ্গী হিসেবে আক্রমণে দেখা যেতে পারে হুলিয়ান আলভারেজ কিংবা লাউতারো মার্টিনেজকে।
মিসরের বিপক্ষে ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলের অ্যাসিস্ট করেছিলেন মার্টিনেজ। লেফট-ব্যাক পজিশনের জন্য ফাকুন্দো মেদিনা ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর মধ্যে লড়াই চলছে। স্কালোনির পুরো স্কোয়াডই প্রায় শতভাগ ফিট থাকলেও সুইজারল্যান্ডের কোচ ইয়াকিন দুশ্চিন্তায় আছেন তিন খেলোয়াড়কে নিয়ে মিশেল এবিশার, লুকা জাকুয়েজ এবং প্রিমিয়ার লিগের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ইয়োহান মানজাম্বি।
হাঁটুর চোটে শেষ ষোলোর ম্যাচ মিস করার আগে সুইজারল্যান্ডের মানজাম্বি প্রথম একাদশে জায়গা পাকা করে তিনটি গোল করেছিলেন। তার পরিবর্তে এসি মিলানের আর্দন জাশারি খেলেছিলেন এবং এবারও একাদশে থাকতে পারেন। আক্রমণভাগে ব্রিল এম্বোলোই সুইজারল্যান্ডের প্রধান ভরসা।
জাতীয় দলের হয়ে শেষ ১৭ ম্যাচে তিনি সরাসরি ১৩টি গোলে অবদান রেখেছেন। যদিও কলম্বিয়ার বিপক্ষে তিনি কোনো শট নিতে পারেননি এবং প্রতিপক্ষের বক্সে মাত্র একবার বল ছুঁয়েছিলেন, তবু রেনের এই স্ট্রাইকারের একাদশে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। জেকি আমদুনি ও সেড্রিক ইত্তেনকে তাই সাইড বেঞ্চেই থাকতে হতে পারে।
কাগজে-কলমে এবং সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও নকআউট পর্বে অতীতের হিসাব খুব কমই গুরুত্ব পায়। শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ আর দলগত ফুটবলে ভর করে সুইজারল্যান্ডও ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে। তাই সেমিফাইনালের টিকেট নিশ্চিত করতে দুই দলের লড়াই যে হবে রোমাঞ্চে ভরপুর, তা বলাই যায়। শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা ও তারকার ঝলক জয়ী হবে, নাকি সুইসদের অদম্য লড়াই নতুন ইতিহাস লিখবে সেই উত্তর মিলবে মাঠে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও