একসময় উত্তর ইউরোপের উত্তাল সমুদ্র ছিল ভাইকিংদের দখলে। বিশাল যুদ্ধজাহাজে চড়ে ঝড়-তুফান উপেক্ষা করে তারা ছুটে যেত অজানা দিগন্তের সন্ধানে। সাহস, শৃঙ্খলা আর নির্ভীক মনোভাবই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে সেই ভাইকিংদের উত্তরসূরিরা আজ আর হাতে তলোয়ার নয়, পায়ে ফুটবল নিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে। আর সেই স্বপ্নের সামনে এবার দাঁড়িয়ে আছে ফুটবলের জন্মভূমি ইংল্যান্ড। যে দেশের ইতিহাসে লেখা আছে আধুনিক ফুটবলের সূচনা, আবার অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাসও।
মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ৩টায় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। ঐতিহ্যের বিপক্ষে আত্মপ্রকাশ, অভিজ্ঞতার বিপক্ষে নির্ভীকতার এবং অতীতের গৌরবের বিপক্ষে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার এক রোমাঞ্চকর দ্বৈরথ।
বিশ্ব ফুটবলের জন্মভূমি ইংল্যান্ড। আধুনিক ফুটবলের নিয়ম-কানুন, পেশাদার লিগ এবং ক্লাব সংস্কৃতির পথচলা শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। অথচ এত সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের পরও বিশ্বকাপ ট্রফি তাদের হাতে উঠেছে মাত্র একবার। ১৯৬৬ সালে ওয়েম্বলিতে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল থ্রি লায়ন্স। জিওফ হার্স্টের ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক আর অধিনায়ক ববি মুরের হাতে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সেই দৃশ্য আজও ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবময় স্মৃতি। এরপর প্রতিটি বিশ্বকাপেই স্বপ্ন জেগেছে, কিন্তু ট্রফি অধরাই থেকে গেছে।
এবার সেই অপেক্ষা ঘোচানোর মিশনে নেমেছে টমাস টুখেলের দল। গ্রুপ পর্বে দাপুটে পারফরম্যান্সের পর শেষ ষোলোতে স্বাগতিক মেক্সিকোর বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষায় পড়ে ইংল্যান্ড। উচ্চতা, গ্যালারিভর্তি সমর্থকের চাপ এবং প্রতিপক্ষের দুর্দান্ত ছন্দ। সব বাধা পেরিয়ে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয় তুলে নেয় তারা। জুড বেলিংহামের জোড়া গোল ও হ্যারি কেইনের পেনাল্টিতে নিশ্চিত হয় শেষ আট। মাত্র ৩৩.২ শতাংশ বলের দখল রেখেও জয় পাওয়ার মাধ্যমে ইংল্যান্ড দেখিয়েছে, আধিপত্য নয়, কার্যকারিতাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
অন্যদিকে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত গল্পগুলোর একটি লিখেছে নরওয়ে। গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের কাছে হারলেও সেটি ছিল দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে খেলার ফল। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। শেষ ষোলোতে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্ব ফুটবলকে চমকে দিয়েছে স্টালে সোলবাকেনের দল। আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোল আর দলের শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল বুঝিয়ে দিয়েছে, নরওয়ে আর শুধু সম্ভাবনার দল নয়; তারা এখন বাস্তব হুমকি।
পরিসংখ্যান অবশ্য ইংল্যান্ডের পক্ষেই।
দুদলের ১১টি মুখোমুখি ম্যাচে সাতবার জিতেছে ইংল্যান্ড, নরওয়ের জয় মাত্র দুটি। সবশেষ চার দেখায় নরওয়ে ইংল্যান্ডের জালে বলই জড়াতে পারেনি। সবশেষ ২০১৪ সালের প্রীতি ম্যাচে ওয়েন রুনির একমাত্র গোলে জয় পেয়েছিল ইংলিশরা। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইতিহাস খুব কমই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। ব্রাজিলকে বিদায় করা নরওয়ে ইতিমধ্যেই সেই বার্তাই দিয়েছে।
ইংল্যান্ড শিবির থেকে কোচ জানিয়েছেন, নরওয়েকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ব্রাজিলকে হারানো একটি দলের বিপক্ষে শতভাগ মনোযোগ নিয়েই খেলতে হবে। দলের খেলোয়াড়রাও একই সুরে বলেছেন, নরওয়ের সংগঠিত ফুটবল ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। অন্যদিকে নরওয়ে কোচের ভাষ্য, ব্রাজিলকে হারানো অতীত, এখন সামনে আরও বড় পরীক্ষা। ইংল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম সেরা দল হলেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিজেদের পরিকল্পনা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে যে কাউকেই হারানো সম্ভব বলে বিশ্বাস তার।
এই ম্যাচে চোখ থাকবে দুই মহাতারকার দিকে। ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন বড় ম্যাচের পরীক্ষিত গোলদাতা। তার সঙ্গে জুড বেলিংহামের দুর্দান্ত ফর্ম, ডেকলান রাইসের ভারসাম্য এবং বুকায়ো সাকার গতি ইংল্যান্ডকে ভয়ংকর করে তুলেছে। অন্যদিকে নরওয়ের আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু আর্লিং হালান্ড। এবারের বিশ্বকাপে সাত গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে থাকা এই স্ট্রাইকার যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারেন। তাকে সহায়তা করবেন মার্টিন ওডেগার্ড, আন্তোনিও নুসা ও অস্কার বব।
এই ম্যাচে লাল কার্ডের কারণে ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার জ্যারেল কোয়ানসাহকে পাচ্ছে না। চোটে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে অভিজ্ঞ জর্ডান হেন্ডারসনের। তবে ডেকলান রাইস ও মার্ক গেহিকে নিয়ে শঙ্কা কেটে গেছে। নরওয়ের জন্য সুখবর, ব্রাজিল ম্যাচে চোট পাওয়া ডেভিড মোলার উলফে অনুশীলনে ফিরেছেন। ফলে প্রায় পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই মাঠে নামতে পারবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা।
কৌশলগত লড়াইটাও হবে দারুণ আকর্ষণীয়। ইংল্যান্ড বলের দখল রেখে ধৈর্য নিয়ে আক্রমণ গড়তে চাইবে। অন্যদিকে নরওয়ে অপেক্ষা করবে প্রতিআক্রমণের। হালান্ডের গতি আর ওডেগার্ডের নিখুঁত পাস কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ডের রক্ষণে আঘাত হানাই হবে তাদের পরিকল্পনা। ফলে মাঝমাঠের লড়াই এবং দুদলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তাই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে ভুলের কোনো সুযোগ নেই। একটি পাস, একটি শট কিংবা একটি মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের গল্প। ইংল্যান্ড চাইবে ছয় দশকের অপেক্ষা শেষ করার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে। আর নরওয়ে চাইবে ভাইকিংদের সেই অদম্য সাহসকে সঙ্গী করে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিতে।
মিয়ামির রাত তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের সাক্ষী হবে না; সেটি হয়ে উঠবে ইতিহাস আর স্বপ্নের, অভিজ্ঞতা আর সাহসের, থ্রি লায়ন্স আর ভাইকিং উত্তরসূরিদের এক মহারণ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও