সব গল্পের শুরু আলো দিয়ে হয় না। কিছু গল্প শুরু হয় অন্ধকার দিয়ে। উসমান দেম্বেলের গল্পও তেমনই। যে ছেলেটির শৈশব কেটেছে অভাবের সঙ্গে লড়াই করে, যে তরুণকে একসময় বার্সেলোনার সবচেয়ে ব্যর্থ বিনিয়োগ বলা হয়েছিল, সেই মানুষটিই আজ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের স্বপ্নের অন্যতম বড় কারিগর।
২০২৬ বিশ্বকাপে এমবাপের ঝলকানির পাশাপাশি ফ্রান্সের আক্রমণের আরেকটি উজ্জ্বল নাম দেম্বেলে। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত তার ঝুলিতে ৫টি গোল। মরক্কোর বিপক্ষে শেষ আটের লড়াইয়ে ম্যাচের ৬৬ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে দুরন্ত গতিতে উঠে এসে করা গোলটি শুধু ফ্রান্সের ২-০ ব্যবধানের জয়ই নিশ্চিত করেনি, দলকে পৌঁছে দিয়েছে সেমিফাইনালেও।
এমবাপে-দেম্বেলে জুটি এখন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। ২০০২ বিশ্বকাপে রোনালদো-রিভালদোর পর এমন কার্যকর আক্রমণ জুটি খুব কমই দেখেছে বিশ্বকাপ। কিন্তু আজ যে পায়ের জাদুতে ফ্রান্স এগিয়ে যাচ্ছে, সেই পায়ের পথচলা ছিল কাঁটায় ভরা।
ফ্রান্সের ভার্ননে এক অভিবাসী পরিবারে জন্ম দেম্বেলের। বাবা মালির, মা মৌরিতানিয়ার। সংসারে ছিল অভাব, ছিল অনিশ্চয়তা। সেই অনিশ্চয়তার মাঝেও ছেলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন মা ফাতিমাতা। দেম্বেলের বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, তখন ফুটবল একাডেমিতে সুযোগ পাওয়ার কারণে পুরো পরিবারকে রেনেস শহরে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। সীমিত সামর্থ্যরে সেই মা কখনো ফুটবল বুটের টাকা জোগাড় করেছেন, কখনো ছেলেকে অনুশীলনে নিয়ে গেছেন, আবার কখনো নিজের কষ্ট আড়াল করে তাকে সাহস জুগিয়েছেন। দেম্বেলের প্রথম কোচ, প্রথম অভিভাবক এবং সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন
তার মা।
সেই ছেলেটিই ২০১৭ সালে নেইমারের উত্তরসূরি হিসেবে প্রায় ১০৫ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফিতে বার্সেলোনায় যোগ দিলেন। মনে হয়েছিল ইউরোপের ফুটবলে নতুন এক সুপারস্টারের জন্ম হলো। কিন্তু ন্যু ক্যাম্পের সবুজ ঘাস যেন তার জন্য অপেক্ষা করছিল না; অপেক্ষা করছিল হাসপাতালের সাদা বিছানা। একের পর এক হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি, পেশির চোট, অস্ত্রোপচার আর দীর্ঘ পুনর্বাসন।
দেম্বেলের বার্সেলোনা ক্যারিয়ার ধীরে ধীরে পরিণত হয় এক দুঃস্বপ্নে। তিনি মাঠে ফেরেন, আবার চোটে পড়েন। ছন্দে ফেরেন, আবার হারিয়ে যান। একসময় তার নামের পাশেই জুড়ে যায় ‘ইনজুরি-প্রোন’ তকমা।
চোটের চেয়েও ভয়ংকর ছিল মানুষের কথা। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম তাকে ‘অপেশাদার’ বলেছে, ভিডিও গেম খেলা থেকে শুরু করে অনুশীলনে দেরি- সবকিছু নিয়েই হয়েছে তীব্র সমালোচনা। অনেকেই তাকে বার্সেলোনার ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যর্থ ব্যয়বহুল সাইনিংদের একজন বলেও আখ্যা দিয়েছেন। একসময় মনে হয়েছিল ২৫ বছর বয়সেই বুঝি শেষ হয়ে যাবে তার ক্যারিয়ার। কিন্তু কিছু মানুষ ভেঙে পড়ার জন্য জন্মায় না। তারা ভেঙে গিয়ে আরও শক্ত হয়ে ফিরে আসে।
দেম্বেলেও তাই করেছেন। নিজের জীবনযাপন বদলেছেন, খাদ্যাভ্যাসে এনেছেন শৃঙ্খলা, ফিটনেসকে দিয়েছেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব। প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ে যোগ দেওয়ার পর যেন তিনি নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করেন। হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। মাঠে নিয়মিত খেলতে শুরু করেন, আবার হয়ে উঠেন সেই ভয়ংকর উইঙ্গার, যাকে একসময় ইউরোপের সবচেয়ে প্রতিভাবান তরুণ বলা হতো।
আজ সেই রূপান্তরের পূর্ণতা দেখা যাচ্ছে বিশ্বকাপে। এমবাপেকে আটকে রাখতে গিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা যখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন ডান প্রান্ত দিয়ে ঝড় তোলেন দেম্বেলে। তার গতি, দুই পায়ে সমান দক্ষতা, নিখুঁত ড্রিবলিং এবং গোল করার সহজাত ক্ষমতা ফ্রান্সকে দিয়েছে বাড়তি ধার। পাঁচ গোল করে তিনি শুধু নিজের সামর্থ্যই প্রমাণ করেননি, বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা পারফর্মার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ফুটবলের ইতিহাসে এমন অনেক প্রতিভা আছে, যাদের গল্প শেষ হয়ে গেছে চোটের কাছে। উসমান দেম্বেলের গল্প আলাদা। কারণ তিনি প্রমাণ করেছেন, শরীর ভেঙে যেতে পারে, আত্মবিশ্বাসও টলতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন যদি বেঁচে থাকে, তা হলে প্রত্যাবর্তনও সম্ভব।
একসময় বার্সেলোনার হাসপাতালের করিডোর ছিল তার সবচেয়ে পরিচিত ঠিকানা। আজ তার ঠিকানা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। একসময় যাকে নিয়ে লেখা হতো হতাশার গল্প, আজ তাকে নিয়েই লেখা হচ্ছে ফ্রান্সের নতুন স্বপ্নের উপাখ্যান। আর এ কারণেই দেম্বেলের গল্প শুধু একজন ফুটবলারের নয়; এটি বিশ্বাস, ধৈর্য আর ফিরে আসার এক অনন্য কাব্য।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও