বিশ্ব ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত। যে দল বেশি দৌড়াবে, তারাই ম্যাচে আধিপত্য করবে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে আর্জেন্টিনা। লিওনেল স্কালোনির দল যেন প্রমাণ করছে, ফুটবলে শুধু শারীরিক পরিশ্রম নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও মুহূর্তকে কাজে লাগানোর ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
আর্জেন্টিনার পুরো কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সি এই তারকাকে পুরো ম্যাচ সতেজ রাখতে দলটি নিজেদের খেলার ধরনই বদলে ফেলেছে। অযথা চাপ সৃষ্টি বা অপ্রয়োজনীয় দৌড়ের বদলে তারা বলের ব্যবহার, অবস্থান নির্বাচন এবং প্রয়োজনীয় মুহূর্তে গতি বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। ফলে মেসিও শেষ বাঁশি পর্যন্ত ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
পরিসংখ্যানও সেই পরিকল্পনার সফলতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। বিশ্বকাপের ৪৮টি দলের মধ্যে প্রতি ম্যাচে উচ্চগতিতে সবচেয়ে কম দৌড়ানো দলের তালিকায় আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়। আর এক নম্বরে রয়েছে কাতার। দ্রুতগতির স্প্রিন্টের সংখ্যাও টুর্নামেন্টের অন্যতম কম। অথচ এই তুলনামূলক কম পরিশ্রম নিয়েই তারা টানা পাঁচ ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। একই রেকর্ড রয়েছে কেবল ফ্রান্সের।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, এখন পর্যন্ত পাঁচটি ম্যাচের প্রতিটিতেই আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের তুলনায় কম মোট দূরত্ব অতিক্রম করেছে। কোনো ম্যাচে ব্যবধান ছিল মাত্র ৬১৫ মিটার, আবার কোনো ম্যাচে তা ছাড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। তবু ফলাফল বদলায়নি। প্রতিবারই জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে আলবিসেলেস্তেরা।
বল দখলেও খুব বেশি আধিপত্য দেখাতে পারেনি দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়নরা। শুধু আলজেরিয়ার বিপক্ষে তাদের বল দখলের হার প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি ছিল। আবার উচ্চগতিতে দৌড়ের পরিসংখ্যানে কেবল কেপভার্দের বিপক্ষেই এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। এই হিসাব তৈরির সময় অতিরিক্ত সময়, ইনজুরি টাইম ও পানি বিরতির মতো বিষয়ও আলাদাভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা দলগুলোর মধ্যে মরক্কো সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করেছে। আফ্রিকার প্রতিনিধিরা প্রতি মিনিটে আর্জেন্টিনার তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি উচ্চগতিতে দৌড়েছে। নরওয়ে, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড ও স্পেনও গতি ও স্প্রিন্টের পরিসংখ্যানে অনেক এগিয়ে। তবু শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল দলগুলোর একটি আর্জেন্টিনাই।
স্কালোনির দলের এই বিশ্বকাপ যাত্রা তাই একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। ফুটবল শুধু দৌড়ের লড়াই নয়। সঠিক ছন্দ, পরিকল্পিত শক্তি সঞ্চয় এবং মেসির মতো একজন অসাধারণ ফুটবলারের সামর্থ্যকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে শিরোপা জয়ের সবচেয়ে কার্যকর সমীকরণ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও