বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ফুলশ্রী গ্রাম এখন অনেকটাই জনশূন্য হয়ে পড়েছে। গ্রেফতার আসামি ওই গ্রামের রিয়াজ ফকিরের (২৬) পুলিশের নির্যাতনে মৃত্যুর গুজবে তার স্বজন ও এলাকাবাসী মিছিল নিয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধর করে আহত করেন। এ ঘটনায় মামলার পর গ্রেফতার আতঙ্কে গ্রামের অধিকাংশ নারী ও পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ফলে গ্রামের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
অপরদিকে থানা পুলিশের করা মামলায় ৪৩ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও তিন শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ২২ জন নারী ও পুরুষকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
মামলার এজাহারে নামোল্লেখ করা আসামি নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী মিছিল নিয়ে থানায় ঢুকে হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও এজাহারে যাদের আসামি করা হয়েছে তা নিয়ে পুরো উপজেলাজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামলার ঘটনার সঙ্গে থানা সংলগ্ন বাকাল ইউনিয়নের ফুলশ্রী গ্রামের নারী ও পুরুষরা জড়িত থাকলেও মামলার এজাহারে রাজিহার ও গৈলা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও ঘটনার সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও যুগান্তর প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক ও বাংলা টিভির বরিশাল প্রতিনিধি এফএম নাজমুল রিপনকে মামলার আসামি করা হয়েছে। একইসঙ্গে দীর্ঘদিন পর্যন্ত নিজ এলাকা গৈলা ইউনিয়নের সেরাল গ্রাম থেকে আত্মগোপনে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ, আওয়ামী যুবলীগের আগৈলঝাড়া উপজেলা শাখার সভাপতি কামরুজ্জামান আজাদ সেরনিয়াবাত ও জেলা যুবলীগ নেতা সাগর সেরনিয়াবাতকে আসামি করা হয়েছে।
দুইজন সাংবাদিক নেতাকে আলোচিত এ মামলায় আসামি করার বিষয়টি সম্পূর্ণ রহস্যজনক দাবি করে শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দরা স্থানীয় সংসদ সদস্য ও তথ্যমন্ত্রী এম জহির উদ্দিন স্বপনকে পুরো বিষয়টি অবহিত করেন। প্রেসক্লাব কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে তথ্যমন্ত্রীর মতবিনিময় সভায় বিষয়টি জানানো হয়।
পরবর্তীতে থানার ওসির উপস্থিতিতে তথ্যমন্ত্রী সঠিক তদন্ত করে ও পুরো ঘটনার ভিডিওচিত্র পর্যালোচনা করে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলায় যেন হয়রানি করা না হয়, সে ব্যাপারে ভূমিকা নেওয়ার জন্য ওসিকে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি তথ্যমন্ত্রী পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেফতারপূর্বক আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতা করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান করেন।
অপরদিকে বরিশালের পুলিশ সুপার এজেডএম মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, থানায় হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিওচিত্র এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পাশাপাশি পুলিশ সুপার আরও বলেছেন, যদি কারো নাম ভুলবশত এজাহারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, আর তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তাহলে তাদের কোনো ধরনের হয়রানি বা গ্রেফতার করা হবেনা। আপাতত ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
সূত্রমতে, আলোচিত এ মামলায় যারা কারাগারে রয়েছেন, রিয়াজ ফকিরের বাবা সিদ্দিক ফকির, বোন শারমিন আক্তার, গিয়াস ফকির, সবুজ ফকির, মান্নান ফকির, রিফাত ফকির, নাঈম ফকির, হাবিবুর রহমান, রাজু হাওলাদার, তাহমিনা বেগম, মনোয়ারা বেগম, আসমা আক্তার, মমতাজ বেগম, ঝুমুর বেগম, নাজমা আক্তার, তানজিলা আক্তারসহ মোট ২২ জন। গ্রেফতারদের মধ্যে ১২ জন নারী ও ১০ জন পুরুষ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফুলশ্রী গ্রামের একাধিক ব্যক্তিরা বলেন, গ্রেফতার নাঈম ফকির ঘটনার দিন বাড়িতে ছিলেন না। মিছিল কিংবা থানার কোনো ঘটনায়ও সে (নাঈম) উপস্থিত ছিলেন না। তারপরেও তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। যে কারণে পুরো গ্রামের তরুণ ও যুব সমাজসহ সব বয়সের নারী-পুরুষের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে পুরো ফুলশ্রী গ্রাম এখন অনেকটাই জনশূন্য হয়ে পরেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ টহল অব্যাহত রয়েছে। যে কারণে পুলিশের চলমান অভিযানের কারণে গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের নারী ও পুরুষ সদস্যরা অনেকটাই আত্মগোপনে রয়েছেন।
থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সন্ধ্যায় নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে চুরি মামলার সন্ধিগ্ধ আসামি ফুলশ্রী গ্রামের রিয়াজ ফকিরকে একটি চুরির মামলায় গ্রেফতার করা হয়। থানা হাজতে থাকার সময় রিয়াজ লোহার দরজার সঙ্গে নিজের মাথায় নিজে আঘাত করে জ্ঞানশূন্য হয়ে পরে। পরে ওইদিন রাত ১১টার দিকে তাকে প্রথমে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে গভীর রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে তার স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিকেলে কয়েকশ মানুষ মিছিল নিয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা চালায়। এ সময় থানার বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুরসহ কর্তব্যরত ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিমকে মারধর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশের ছয় সদস্যসহ অন্তত ১২ জন আহত হন।
এ ঘটনায় আগৈলঝাড়া থানার এসআই ওমর ফারুক বাদী হয়ে মামলায় বেআইনি সমাবেশ ও দাঙ্গা, অনধিকার প্রবেশ, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, সরকারি কাজে বাধা প্রদান, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, গুরুতর আঘাত এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
সময়ের আলো/জোই