আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের প্রকোপ। রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। পাঁচ শয্যার আইসোলেশন কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে শিশুদের। শয্যা না পেয়ে অনেককে হাসপাতালের বারান্দা ও ফ্লোরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে পর্যাপ্ত ওষুধও মিলছে না। এতে চিকিৎসাসেবা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের পুরোনো ডায়রিয়া ওয়ার্ডকে পাঁচ শয্যার হাম আইসোলেশন কক্ষে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে তিন সিটে ৭ থেকে ৮টি শিশু স্বজনদের নিয়ে গাদাগাদি করে অবস্থান করছে। ওয়ার্ডটির দরজা-জানালা ভাঙা এবং কক্ষটি জরাজীর্ণ। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার বারান্দাজুড়েও শিশুদের চিকিৎসা চলছে।
একই পথে অন্যান্য রোগী, স্বজন ও সেবাগ্রহীতাদের চলাচল করতে দেখা গেছে যা সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। হামে আক্রান্ত রোগীদের পৃথক আইসোলেশন কক্ষে, পরিচ্ছন্ন ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলকারী পরিবেশে চিকিৎসা দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি রোগীর সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত শয্যা, ওষুধ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তবে আজমিরীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেই সক্ষমতার ঘাটতির চিত্রই মিলেছে। জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা অনুযায়ী, আক্রান্ত রোগীকে পৃথক আইসোলেশন কক্ষে রেখে চিকিৎসা দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ এড়ানো জরুরি। কিন্তু শয্যা সংকটের কারণে আজমিরীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনেক শিশুকে বারান্দা ও ফ্লোরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। একই পথে অন্যান্য রোগী, স্বজন ও সেবাগ্রহীতাদের চলাচল করতে দেখা গেছে, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০ দিনের ব্যবধানে হামে আক্রান্ত হয়ে ৩১ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার করা হয়েছে অথবা ছাড়পত্র নিয়ে চলে যেতে হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৬টি শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে আজমিরীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হোসেন বলেন, হামে আক্রান্ত সব রোগীকেই হাসপাতালে ভর্তি থাকার প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকরা রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেন। যাদের অবস্থা হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার, তাদের বাড়িতে থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা ও ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। আর যাদের অবস্থা গুরুতর তাদের হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়। প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়। কোনো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হোসেন আরও বলেন, উপজেলা পর্যায়ে পাঁচ শয্যার একটি আইসোলেশন কক্ষ রাখার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। আমরা সেই অনুযায়ী আইসোলেশন কক্ষ চালু করেছি। তবে দিন দিন রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি হচ্ছে। রোগীদের সুবিধার্থে আরও একটি আইসোলেশন কক্ষ প্রস্তুতের কাজ চলছে। হাসপাতাল থেকে সরকারি ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন
সরেজমিন কথা হয় হামে আক্রান্ত এক শিশুর স্বজন ফাতেমা বেগমের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, পাঁচ দিন আগে নাতিকে ভর্তি করেছি। প্রথম তিন দিন ফ্লোরে থাকতে হয়েছে। পরে একটি বেড পেলেও ছোট্ট কক্ষে আরও সাতজন শিশুর সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে কক্ষে পানি ঢুকে পড়ে, সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব বাড়ে। হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাই না। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বাইরে থেকে সব ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
হামে আক্রান্ত শিশু রায়হানের মা সুইটি বেগম বলেন, ছেলেকে ভর্তি করানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বেড না পেয়ে বারান্দার ফ্লোরেই থাকতে হচ্ছে। পরে একই রোগে আক্রান্ত মেয়েকেও ভর্তি করাতে হয়েছে। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে বারান্দাতেই আছি। হাসপাতাল থেকে শুধু একটি স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। আরেক অভিভাবক রহমত আলী বলেন, পাঁচ বছরের ছেলেকে ভর্তি করেছি। কোনো শয্যা পাইনি। বারান্দার খোলা জায়গায় থাকতে হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হয়নি। সবই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হামের প্রকোপ বাড়লেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো শয্যা, আইসোলেশন সুবিধা ও পর্যাপ্ত ওষুধ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে রোগী ও তাদের স্বজনরা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি