সম্প্রতি প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ঘিরে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর দাবি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে তাকে সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে তার সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা চলছিল। এমনকি ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে তাকে সামনে এনে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি পরিকল্পনাও নাকি বিবেচনায় ছিল। তবে এসব দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে এবং স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইসরায়েল কিংবা আহমাদিনেজাদের পক্ষ থেকেও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের শুরুতে হাঙ্গেরির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বাইরে থেকে এটি ছিল একটি একাডেমিক অনুষ্ঠান, কিন্তু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে এর আড়ালে ছিল ভিন্ন উদ্দেশ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই সফরের সুযোগে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা পরে জানান, শুরুতে এমন প্রস্তাবে তিনি বিস্মিত হলেও শেষ পর্যন্ত এতে সম্মতি দেন। তার যুক্তি ছিল, যদি দুই বৈরী পক্ষ আলোচনায় বসতে চায়, তাহলে সেই সুযোগ সৃষ্টি করা সংঘাত কমানোর একটি সম্ভাব্য উপায় হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক বছরের ব্যবধানে বিদেশের বিভিন্ন স্থানে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি দাবি করা হয়েছে যে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের তৎকালীন প্রধানও ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই যোগাযোগের বিষয়টি পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকেও জানানো হয়েছিল।
যদিও এসব দাবি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে, তবে এগুলোর পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো নথি বা সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো ইরানে সংঘাত শুরু হওয়ার পর আহমাদিনেজাদকে ঘিরে কথিত একটি উদ্ধার অভিযান।
দাবি করা হয়, তার বাসভবনের আশপাশে হামলার পর একটি গাড়িতে করে তাকে দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পরে তাকে একটি গোপন নিরাপদ স্থানে রাখা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়ার চিন্তা ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তিনি ওই নিরাপদ স্থান ত্যাগ করেন এবং এরপর দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে আহমাদিনেজাদ ইরানের নিরাপত্তা সংস্থার কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছেন। কিছু সূত্রের মতে, তার কথিত বিদেশি যোগাযোগ সম্পর্কে ইরানি কর্তৃপক্ষ অবগত হওয়ার পর থেকেই তার চলাফেরার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
তবে এসব তথ্যেরও স্বাধীন কোনো সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আহমাদিনেজাদ ছিলেন ইরানের সবচেয়ে কঠোরপন্থী নেতাদের একজন। তার বক্তব্যে প্রায়ই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হতো। তার শাসনামলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর তার রাজনৈতিক আচরণে ধীরে ধীরে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তিনি আগের তুলনায় অনেক সংযত ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেন এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে থাকেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তিনি নিজের ভাবমূর্তি নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন যাতে ভবিষ্যতে আবারও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
ক্ষমতা ছাড়ার পর আহমাদিনেজাদ নিয়মিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। বিভিন্ন এলাকা সফর করে মানুষের অভিযোগ শুনতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের সমস্যার সমাধানের সুপারিশও করতেন।
তার পোশাক, জনসমক্ষে উপস্থিতি এবং বক্তব্যেও পরিবর্তন আসে। আগের তুলনায় আরও পরিপাটি ও আন্তর্জাতিক ধাঁচের উপস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশ সফরের সময় ইরানের নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা সবসময় তার সঙ্গে থাকতেন। একাধিক সফরে তিনি নিরাপত্তাকর্মীদের অগোচরে কিছু সময়ের জন্য নিখোঁজ ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। পরে তিনি এসব বৈঠককে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বা শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
আহমাদিনেজাদের সাবেক ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরতে আগ্রহী ছিলেন। কয়েকবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না পাওয়ার পর তিনি মনে করেছিলেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে তার ফিরে আসা সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, তিনি বিশ্বাস করতেন যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এলে তিনি নিজেকে একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কয়েক বছর ধরেই তার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে বিদেশি নেতাদের সঙ্গে প্রকাশ্য যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
সংঘাতের পর দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকার পর তাকে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজার অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেখা যায়। সেখানে তিনি খুব অল্প সময় অবস্থান করেন এবং কারও সঙ্গে প্রকাশ্যে কথা বলেননি। তার চারপাশে নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে যে তথ্যগুলো প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো মূলত বিভিন্ন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এসব দাবির অনেকগুলোর স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগগুলো স্বীকার বা নিশ্চিত করেনি। তাই ঘটনাগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উত্থাপিত দাবি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ