বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে টোল আদায়ের ঘোষণা দিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, এমন একটি আন্তর্জাতিক প্রণালিতে যাতায়াতের জন্য কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে ফি বা টোল আদায় করতে পারে না। ফলে ট্রাম্পের প্রস্তাব আইনগতভাবে কতটা বৈধ, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক সনদ (আনক্লজ) অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিসহ বিশ্বের শতাধিক আন্তর্জাতিক প্রণালির মধ্য দিয়ে সব দেশের জাহাজের অবাধ ও বিনামূল্যে চলাচলের অধিকার রয়েছে। ১৯৯৪ সাল থেকে কার্যকর এই সনদের ৩৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রণালির তীরবর্তী কোনো রাষ্ট্র কেবল যাতায়াতের অনুমতির বিনিময়ে অর্থ দাবি করতে পারে না। বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন হিসেবেও স্বীকৃত।
তবে এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম রয়েছে। যেসব দেশ শুরু থেকেই এই চুক্তির বিরোধিতা করেছে এবং এতে স্বাক্ষর করেনি, তারা নিজেদের ওপর এর বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য নয় বলে দাবি করতে পারে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অবস্থান বজায় রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও আনক্লজ অনুসমর্থন না করলেও এতদিন ইরানের এককভাবে টোল আরোপের ধারণার বিরোধিতা করেছে।
কিন্তু এবার অবস্থান বদলানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। সোমবার (১৩ জুলাই) ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ কার্যকর করবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে হরমুজ প্রণালির ‘মালিক’ হিসেবে কাজ করবে এবং এ নৌপথে পরিবাহিত সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে টোল আদায় করবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার খরচ হিসেবে এই অর্থ নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত বাস্তবে হরমুজ প্রণালিতে কোনো টোল আদায় করেনি। ফলে ট্রাম্পের ঘোষণা বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এর আগে গত এপ্রিলে ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে নৌ অবরোধ শুরু করলেও জুনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার পর তা স্থগিত করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিতকারীর পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে সেই অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বরং ইরানের। তার দাবি, হরমুজ প্রণালির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ইরানের এবং ভবিষ্যতেও তা থাকবে। তবে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ শতাংশ টোলকে তিনি অতিরিক্ত বলে মন্তব্য করেন।
এদিকে ট্রাম্পের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এশিয়ার শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এমএসসিআই এশিয়া-প্যাসিফিক সূচক ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার ২ দশমিক ২ শতাংশ ঊর্ধ্বগতিতে নেতৃত্ব দিয়েছে। জাপানের নিক্কেই সূচক ০ দশমিক ২ শতাংশ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার সূচক ০ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।
মেলবোর্নভিত্তিক পেপারস্টোন গ্রুপের গবেষণা প্রধান ক্রিস ওয়েস্টন বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরেই এমন ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। তবে সর্বশেষ ঘোষণার পর বাজার পরিস্থিতি আরও তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে