স্থলযুদ্ধের রূপ বদলে দিচ্ছে ইউক্রেনের রোবট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

শুরুতে আকাশে উড়ন্ত ড্রোন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছিল ইউক্রেন। তবে এখন নীরবে আরেকটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটছে মাটিতে। যাকে সামরিক

2026-07-15T04:41:05+00:00
2026-07-15T04:41:05+00:00
 
  বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬,
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
স্থলযুদ্ধের রূপ বদলে দিচ্ছে ইউক্রেনের রোবট
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৪:৪১ এএম 
স্থলযুদ্ধের রূপ বদলে দিচ্ছে ইউক্রেনের রোবট। সংগৃহীত ছবি
শুরুতে আকাশে উড়ন্ত ড্রোন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছিল ইউক্রেন। তবে এখন নীরবে আরেকটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটছে মাটিতে। যাকে সামরিক ভাষায় বলা হয় ‘আনম্যান্ড গ্রাউন্ড ভেহিকল’ বা ইউজিভি। এর মাধ্যেমে যুদ্ধের সম্মুখসমরের বিপজ্জনক কাজগুলো এই স্থলভাগের রোবট বা চালকবিহীন যান দিয়ে প্রতিস্থাপন করছে। 

ফলে এখন রসদ পরিবহন, গোলাবারুদ বহন, আহত সেনাদের উদ্ধার, মাইন পাতা, এমনকি শত্রুর ট্রেঞ্চ দখলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। ইউক্রেনের সেনারা বলছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে এসব রোবট এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

কারণ রাশিয়ার ড্রোন হামলার কারণে সামনের সারির সেনাদের দীর্ঘ সময় মাটির নিচের বাঙ্কারে অবস্থান করতে হয়। ফলে বিপজ্জনক এলাকায় মানুষের পরিবর্তে রোবট পাঠানোই নিরাপদ বিকল্প হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত এপ্রিলে দাবি করেন, দেশটির বাহিনী কেবল আকাশ ও স্থল ড্রোন ব্যবহার করেই একটি রুশ অবস্থান দখল করেছে। ওই অভিযানে ইউক্রেনের কোনো সেনাকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে যেতে হয়নি।

দি নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, স্থল রোবট প্রযুক্তির উন্নয়নে ইউক্রেন বর্তমানে বিশ্বের অনেক উন্নত সামরিক শক্তিকেও ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু বড় আশ্চর্যের বিষয় হলো এই প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বড় সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা নয়; বরং যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করা মেকানিক, ওয়েল্ডার এবং পদাতিক সেনারা, যারা নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী এসব রোবট তৈরি করছেন। 

ইউক্রেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ইউফোর্স কম্পানির বোর্ড চেয়ারম্যান ওলেক্সি হনচারুক মার্কিন সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, আকাশযানের ড্রোন দ্রুত উন্নত হয়েছে তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের হাতে। কিন্তু স্থল রোবটের উন্নয়ন হয়েছে সামনের সারির সেনা ও মেকানিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল কঠিন কাজগুলোকে আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা।

রাশিয়ার তুলনায় ইউক্রেনের সেনাসংখ্যা কম হওয়ায় প্রতিটি সেনার জীবন রক্ষা দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই স্থল ড্রোনের কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে ‘কিল জোন’ বা প্রাণঘাতী এলাকা অনেক বিস্তৃত হয়েছে। ফলে এমন কিছু গোপন জায়গা তৈরি হয়েছে যে, যেখান থেকে সামনের অবস্থানে পৌঁছানোই সেখানে অবস্থান করার চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

এ কারণে ইউক্রেনের বিভিন্ন ব্রিগেডে শত শত স্থল রোবট মোতায়েন করা হয়েছে। কে-২ ব্রিগেডের একটি স্থল রোবট ইউনিটের কমান্ডার মেজর ওলেক্সান্দর জানান, তাদের ইউনিটে ৬০০-এর বেশি রোবট রয়েছে এবং প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়টি অভিযান পরিচালনা করা হয়।

তিনি বলেন, সৈন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু রসদ পরিবহনের জন্যই চালক সংকট দেখা দিত। স্থল রোবট সেই সমস্যার সমাধান করেছে। এগুলো ছোট হওয়ায় সহজে শনাক্ত করা যায় না এবং ধ্বংস হলেও কোনো সেনার প্রাণহানি ঘটে না। ৩৬তম ব্রিগেডের সার্জেন্ট দিমিত্রো ইভানভ জানান, পর্যাপ্ত রোবট পাওয়ার পর তাদের ইউনিটে রসদ পরিবহন ও সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ মানুষ ছাড়াই সম্পন্ন হচ্ছে।

৯৩তম মেকানাইজড ব্রিগেডের ক্যাপ্টেন ওলেক্সান্দর খারকোভেৎস যুদ্ধের আগে একটি অটোমোটিভ ইলেকট্রনিকস কর্মশালা পরিচালনা করতেন। ২০২৩ সালে ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলে যুদ্ধের সময় বাখমুতের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, মানুষের পরিবর্তে এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যন্ত্রের মাধ্যমেই করা সম্ভব।

পরে তিনি একটি রিমোট কন্ট্রোল গাড়িতে হুক ও মেশিনগান সংযুক্ত করেন, যাতে নিহত বা আহত সেনাদের উদ্ধার করার পাশাপাশি প্রয়োজনে পাল্টা গুলিও চালানো যায়। ওই বছরের শেষ দিকে এই রোবটের মাধ্যমে এমন একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা এক সপ্তাহ ধরে বিশেষ বাহিনীও উদ্ধার করতে পারেনি।

তবে স্থল রোবট এখনও সব পরিস্থিতিতে কার্যকর নয়। খোলা সমতল এলাকায় এগুলো সহজেই শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। মানুষের মতো গাছে ওঠা, ট্রেঞ্চে লাফ দেওয়া বা পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও নেই। এসব সীমাবদ্ধতা কাটাতে প্রকৌশলীরা রোবটে ক্ষুদ্র আকারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজন এবং বন্ধু-শত্রু শনাক্তের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।

যুদ্ধক্ষেত্রে এত এত সীমাবদ্ধতার পরেও ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন, ভবিষ্যতের সেনাবাহিনী স্থল রোবট ছাড়া কল্পনাই করা যায় না।  ২০২৬ সালে দেশটি ৫০ হাজার স্থল রোবট উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। 

এদিকে রাশিয়াও স্থল রোবট ব্যবহার করছে, তবে ইউক্রেনের তুলনায় অনেক কম। ইউক্রেনের গ্রাউন্ড রোবট সিস্টেম নির্মাতাদের সংগঠনের প্রধান মাকসিম ভাসিলচেঙ্কো বলেন, একটি সাঁজোয়া পদাতিক যান কেনার অর্থে একটি ব্রিগেড ৭৭টি স্থল রোবট কিনতে পারে। অর্থাৎ মানুষের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলেই ৭৭ বার অভিযান পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়।


শুরুতে এসব রোবট মূলত রসদ পরিবহনে ব্যবহৃত হলেও এখন সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নিচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউক্রেনের খারতিয়া কর্পস ইতিহাসের প্রথম সম্পূর্ণ রোবটনির্ভর স্থল হামলা পরিচালনা করে। মেশিনগান, ফ্লেমথ্রোয়ার ও বিস্ফোরক বহনকারী স্থল রোবট এবং আকাশে থাকা ড্রোন দিয়ে একসঙ্গে অভিযান চালিয়ে রুশ অবস্থানে হামলা চালানো হয়। 

বর্তমানে কিছু রোবট শুধু হামলাই নয়, আত্মসমর্পণকারী রুশ সেনাদের নিরাপদে ইউক্রেনীয় অবস্থানে নিয়ে আসার কাজও করছে। তৃতীয় অ্যাসল্ট ব্রিগেডের জুনিয়র লেফটেন্যান্ট মাইকোলা জিনকেভিচ নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, তাদের একটি ভারী মেশিনগান সজ্জিত স্থল রোবট টানা ৪৫ দিন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পাহারা দিয়েছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 



  বিষয়:   স্থলযুদ্ধ  রূপ বদল  ইউক্রেন  রোবট 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: