বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে মানুষের আগ্রহ যত বাড়ছে, ততই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সুস্থতাকেন্দ্রিক পর্যটন। তবে আবুধাবির এক ছোট দ্বীপ ঘিরে এমন এক পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা কেবল কয়েক দিনের ছুটির বিষয় হয়েই থাকবে না বরং তা হবে বেঁচে থাকার মূল পদ্ধতি।
আগামী ২০২৯ সালে পুরোপুরি চালু করার জন্য এমনই এক সুস্থতাকেন্দ্রিক পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করছে আবুধাবি সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আলদার ডেভেলপমেন্ট। প্রায় ১০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা) ব্যয়ে তৈরি হওয়া এই প্রকল্পে মোট ৬ হাজারেরও বেশি বাসস্থান থাকবে। শুরু থেকেই পুরো এলাকাটি এমনভাবে তৈরি করা হবে, যাতে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বাড়ে।
পুরো পরিকল্পনাই সুস্থতাকেন্দ্রিক :
আলদারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এমা ম্যাকক্রিয়ারি ব্রিন বলেন, এই প্রকল্পের প্রতিটি নকশা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা সবসময় সুস্থতার দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করেছি। সুস্থ থাকার মূল নীতি হলো, ‘তোমার চারপাশের পরিবেশ যেন তোমার পাশে থাকে, বাধা না হয়।’
এই ধারণাটিকে বলা হয় ‘সুস্থতা স্থাপত্য’। যেখানে কোনো স্থানের নকশা এমন করা হয়, যাতে তা মানুষের শরীর, মন ও মস্তিষ্ককে ভালো রাখতে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষণা বলছে, যে এলাকায় হাঁটার সুব্যবস্থা বেশি, বেশি সবুজ আর প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা থাকে, সেখানকার মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক ভালো থাকেন। ফাহিদ দ্বীপের নকশা ঠিক সেই নীতিগুলোকেই অনুসরণ করছে।
সবুজে ঘেরা হাঁটার উপযুক্ত নিরাপদ এলাকা :
দ্বীপের মাঝে দিয়ে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘বার্ম পার্ক’ তৈরি করা হবে। এখানে থাকবে দৌড়ানোর পথ, তিনটি পৃথক সাইকেল পথ। এই পার্ক সৈকত ও ম্যানগ্রোভ বনের মাঝে একটি প্রাকৃতিক বাধা হিসেবেও কাজ করবে, যাতে শব্দ বা অতিরিক্ত আলো কাউকে বিরক্ত না করে।
মোট ২৭ লাখ বর্গমিটার এলাকার এই দ্বীপজুড়ে ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত থাকবে। সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে অতি বিলাসবহুল ভিলা পর্যন্ত তিন ধরনের বাসস্থান তৈরি করা হবে। অ্যাপার্টমেন্টের দাম শুরু হচ্ছে প্রায় ৫ লাখ ১৭ হাজার ডলার থেকে। সবচেয়ে বিলাসবহুল বাসস্থানের দাম হবে প্রায় ২০ লাখ ডলার।
পুরো দ্বীপজুড়ে ১৫ কিলোমিটার পথ থাকবে যা পায়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য তৈরি। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ পথ ছায়াযুক্ত হবে, যাতে গরমের দিনেও হাঁটতে কোনো সমস্যা না হয়। ব্রিন বলেন, অনেকে ভুল বোঝেন সুস্থতা মানে শুধু যোগব্যায়াম বা জিম। আসলে সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন একে অন্যের সঙ্গে মেলামেশা, খোলামেলা পরিবেশ। আর ফাহিদ দ্বীপে তৈরি করা হচ্ছে সেসব সুযোগ।
বিশ্বের প্রথম ‘ফিটওয়েল’ স্বীকৃত দ্বীপ :
এই দ্বীপে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বরে খুলবে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ‘কিংস কলেজ স্কুল উইম্বলডন’র শাখা। এই স্কুলটি হবে বিশ্বের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেটি ‘ফিটওয়েল’ স্বীকৃতি পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (সিডিসি) তৈরি করা এই স্বীকৃতি দেওয়া হয় এমন স্থাপনাকে, যা সেখানে বসবাস বা পড়াশোনা করা মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর রাখে।
শুধু স্কুলই নয়, পুরো ফাহিদ দ্বীপটিই বিশ্বের প্রথম হিসেবে ফিটওয়েলের সর্বোচ্চ তিন তারকা স্বীকৃতি পেয়েছে। শারীরিক কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকর খাদ্য, মানসিক সুস্থতার মতো বিভিন্ন বিষয়ে বিচার করে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ফিটওয়েল পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর অ্যাক্টিভ ডিজাইন’র প্রধান জোয়ানা ফ্র্যাঙ্ক বলেন, স্বাস্থ্যকে কেবল জিম বা স্পার মতো আলাদা সুবিধা হিসেবে না দেখে, পুরো সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে আলদার। এটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। ফাহিদ দ্বীপ প্রমাণ করবে, কীভাবে শুরু থেকেই স্বাস্থ্যকে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়।
কেবল ‘সুস্থতার প্রচার’ নয়, বাস্তব পদক্ষেপ :
ব্রিন স্পষ্ট করে বলেন, অনেক ভবনে শুধু জিম বা স্পা বানিয়ে দিলেই তাকে সুস্থতাকেন্দ্রিক বলা হয়। কিন্তু আসলে তা নয়। আমরা এমন পরিবেশ তৈরি করছি যেখানে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নেবেন। যাতে প্রতিদিনের জীবনে যেন সঠিক পথ বেছে নেওয়া সহজ হয়ে ওঠে। ব্রিনের ভাষ্যমতে, ফাহিদ দ্বীপের পরিকল্পনা এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে যেখানে সুস্থতা কোনো বিশেষ সুযোগ নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক নিয়ম হয়ে উঠবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি