সামরিক শক্তি প্রয়োগ যেকোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য চূড়ান্ত ও সবচেয়ে সংবেদনশীল পদক্ষেপ। কিন্তু শান্তিদূত সেজে নোবেল পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষা করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে এই শক্তি প্রয়োগ এখন এক ‘খেলার ছলে’ দেওয়া হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তেহরানকে কূটনীতির টেবিলে বাধ্য করতে সামরিক শক্তিকে তিনি এক সাধারণ অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলেছেন।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক যন্ত্রকে মাঠে নামানো মার্কিন কমান্ডারের জন্য সবচেয়ে গুরুতর দায়িত্ব হলেও, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন আচরণে এমন কিছু নজিরবিহীন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা অতীতে তার পূর্বসূরিরা নীতিগত কারণেই এড়িয়ে চলতেন।
বিগত দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি যতই সমালোচিত হোক না কেন, ওয়াশিংটন অন্তত প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার চেষ্টা করত এবং সামরিক শক্তিকে ‘সর্বশেষ পথ’ হিসেবে দেখাত। কিন্তু ট্রাম্প এখন কথায় কথায় ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামো ‘ধ্বংস’ করার হুমকি দিচ্ছেন। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন এবং স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ। ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন হামলা চালান, তখন পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে, ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কিন্তু ট্রাম্প এগুলোকে গণমাধ্যমের সামনে খুব সাধারণ আলোচনা হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী ও অন্তহীন সংঘাতকে বোঝাতে একসময় ‘ফরএভার ওয়ার’ বা ‘চিরকালের যুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো। ইরানেও ট্রাম্প এখন নিজের অজান্তেই একটি অন্তহীন যুদ্ধের ফাঁদে পা দিয়েছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ট্রাম্প এই সংঘাতে জড়ালেও, তেহরানের শাসনব্যবস্থা পতনের পরদিন বা এক মাস পর তার কৌশল কী হবে— সে বিষয়ে ওয়াশিংটনের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।
আমেরিকান জনগণের কাছে ট্রাম্প কখনোই এই যুদ্ধের কোনো অস্তিত্বগত প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেননি। তিনি ভাবছেন, কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মূল্য না চুকিয়েই তিনি এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইরানের ওপর ইতিমধ্যে ১৩ হাজারের বেশি হামলা চালানো হলেও তারা টিকে রয়েছে। উল্টো মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোলাবারুদের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। শত্রুকে যদি আপনি হেয়ালি করে হুমকি দেন, তবে শত্রুও ধরে নেবে যে এই যুদ্ধে আপনার জয়ের ইচ্ছা বা মনোযোগ কতটা দুর্বল।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক আগ্রাসনের সামনে দুটি বড় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রথমত, বিশ্ববাজারে তেলের আকাশচুম্বী দাম, যা মার্কিন অর্থনীতিকে বড় সংকটে ফেলছে। দ্বিতীয়ত, দেশের ভেতরে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা দিন দিন তলানিতে ঠেকছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর বড় খেসারত দিতে হতে পারে রিপাবলিকানদের।
অন্যদিকে, রাশিয়ার মস্কো বা চীনের বেইজিংয়ের মতো বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো ওয়াশিংটনের এই রণকৌশল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। চলতি বছরের শুরুতে দেশের ভেতরে তীব্র জনরোষের মুখে থাকা ইরানের কট্টরপন্থী সরকার কেবল আমেরিকার এই প্রবল সামরিক চাপ উপেক্ষা করে টিকে থাকার মাধ্যমেই এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করে ফেলেছে। হাজারো বিমান হামলা ও একের পর এক শীর্ষ জেনারেলদের গুপ্তহত্যার শিকার হয়েও ইরান যেভাবে আমেরিকার মতো পরাশক্তিকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার পরিস্থিতি তৈরি করতে বাধ্য করছে, তা মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও ট্রাম্পের অপরিপক্ব রণকৌশলকেই বিশ্বমঞ্চে নগ্নভাবে উন্মোচিত করছে।
সময়ের আলো/কহু