ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ম্যাচ আজ। বাংলাদেশ সময় রোববার দিবাগত রাত ১টায় নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে সোনালি ট্রফির লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। দুই দলই পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ ফুটবল, অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব দেখিয়ে জায়গা করে নিয়েছে স্বপ্নের ফাইনালে।
বিশ্বকাপ ফাইনাল মানেই শুধু দুটি দলের লড়াই নয়, বরং অসংখ্য ছোট যুদ্ধের সমষ্টি। কৌশল, পরিসংখ্যান কিংবা সাম্প্রতিক ফর্মের হিসাব-নিকাশের বাইরেও ম্যাচজুড়ে মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে চলতে থাকে কয়েকটি ব্যক্তিগত দ্বৈরথ, যার একটি ট্যাকল, একটি নিখুঁত পাস কিংবা মুহূর্তের এক ঝলক জাদুই বদলে দিতে পারে ম্যাচের গল্প। বিশ্বকাপের ফাইনালেও আর্জেন্টিনা ও স্পেনের লড়াইয়ের পাশাপাশি সমান নজর থাকবে এমন কয়েকটি মুখোমুখি লড়াইয়ে।
একদিকে লিওনেল মেসির সৃজনশীলতা, অন্যদিকে তাকে থামিয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জে স্পেনের রক্ষণ। কোথাও মিকেল ওইয়ারসাবালের গোলের ক্ষুধা, কোথাও তাকে আটকে দেওয়ার অপেক্ষায় ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের বিপক্ষে পেদ্রি-দানি অলমোর বুদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণের লড়াই, আবার দুই প্রান্তে জুলিয়ান আলভারেজ ও লামিন ইয়ামালের গতির প্রতিযোগিতা। সুপার সাব হয়ে লাউতারো মার্টিনেজ ও মিকেল মেরিনো দ্বৈরথ। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ট্রফি কার হাতে উঠবে, তার বড় একটি উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে এই ব্যক্তিগত দ্বৈরথের ফলাফলের মধ্যেই।
সবচেয়ে আলোচিত লড়াইটি হতে যাচ্ছে দুই অধিনায়কের মধ্যে। আর্জেন্টিনার আক্রমণের শুরু কিংবা শেষ সবখানেই থাকবে লিওনেল মেসির উপস্থিতি। তার সৃজনশীলতা, প্রতিটি রক্ষণভেদী পাস, মুহূর্তে তার সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়া ড্রিবল। সব মিলিয়ে তিনিই আর্জেন্টিনার মূল চালিকাশক্তি। তার এসব আক্রমণ, পাসগুলো নিষ্ক্রিয় করার দায়িত্ব থাকবে স্পেন কাপ্তান রদ্রি ও ডিফেন্ডার আইমেরিক লাপোর্তের ওপর। তবে রদ্রি শুধু মেসিকে ট্যাকল করে আটকাতে চাইলে হবে না, অবস্থান নিতে হবে বুঝে-শুনে। কারণ মেসি এক মুহূর্ত সুযোগ পেলেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। আর মেসি যদি সেন্টার ফরোয়ার্ড বা ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠার চেষ্টা করেন তা হলে তাকে আটকানোর দায়িত্ব নিতে হবে আইমেরিক লাপোর্তে বা মার্ক কুকুরেল্লাকে।
আক্রমণের আরেকটি দ্বৈরথ হবে আর্জন্টিনার জুলিয়ান আলভারেজ ও স্পেনের পাউ কুবার্সির মধ্যে। আলভারেজ নিয়ন্ত্রণ প্রেসিং, ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া, বক্সের মধ্যে অবস্থান ও প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারের ওপর চাপ প্রয়োগ তার অন্যতম বড় গুণ। বিপরীতে পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা কুবার্সির সামনে চ্যালেঞ্জ হবে তাকে একটুও ফাঁকা জায়গা না দেওয়া। একটু ভুল অবস্থান কিংবা একটু অসাবধানতাই স্পেনের জন্য বড় হুমকির কারণ হতে পারে। কুবার্সি যদি আলভারেজকে বক্সের বাইরে আটকে দিতে পারে তা হলে গোলরক্ষক উনাই সিমন্স অনেকটাই স্বস্তিতে থাকবে।
স্পেনের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে
থাকবে ওইয়ালসাবাল ও লামিন ইয়ামাল। তাদের আটকে দেওয়ার মূল দায়িত্বে থাকবে ৬ ফুট ১ ইঞ্চির ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর ওপর। বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে প্রতিভাবান তরুণদের একজন লামিন ইয়ামাল।
টুর্নামেন্টজুড়েই ধীরে ধীরে নিজের সেরা ছন্দে ফিরেছেন তিনি। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি কাটিয়ে বিশ্বকাপে খেলতে আসা বার্সেলোনার এই উইঙ্গার এখনও হয়তো শতভাগ ছন্দে পৌঁছাননি। তবে ফাইনালের আগে তার পারফরম্যান্স বলছে, ঠিক সময়েই তিনি সেরা অবস্থান পৌঁছাচ্ছেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার গতিময় দৌড় থেকেই পেনাল্টি আদায় করে স্পেন। পুরো ম্যাচেই ছিলেন প্রাণবন্ত। ইয়ামালকে থামানোর দায়িত্ব থাকবে আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ লেফট-ব্যাক নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর ওপর। ফরাসি ক্লাব লিঁওর এই ডিফেন্ডার চার বছর আগে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন। উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপেও তিনি নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেছেন। একের বিপরীতে এক রক্ষণে তিনি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, পাশাপাশি কৌশলগত সচেতনতাও অসাধারণ।
ফুটবলে একটা কথা প্রচলিত আছে মাঝমাঠ যার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তার। তেমনই এক লড়াই দেখা যাবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে। মাঝমাঠে দেখা যাবে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের শক্তির পরীক্ষা। আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার যেমন বলের দখল ধরে রেখে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবেন, তেমনি পেদ্রি ও দানি অলমো চেষ্টা করবেন সেই ছন্দ ভেঙে দিতে। এনজোর দূরপাল্লার পাস, ম্যাক অ্যালিস্টারের বক্স-টু-বক্স দৌড় এবং পেদ্রির নিখুঁত পাস ও অলমোর আক্রমণাত্মক মানসিকতা। সব মিলিয়ে মাঝমাঠের এই লড়াই হতে পারে পুরো ম্যাচের প্রাণ। যে দল মাঝমাঠে আধিপত্য বিস্তার করবে, তাদের জন্য আক্রমণ গড়ে তোলা যেমন সহজ হবে, তেমনি প্রতিপক্ষের আক্রমণও থামানো সম্ভব হবে।
তাই নিউইয়র্ক নিউ জার্সির সবুজ ঘাসে শুধু দুই দেশের লড়াই নয়; এটি হবে মেসি-রদ্রি, ওয়ারসাবাল-রোমেরো, আলভারেজ-কুবার্সি, এনজো-ম্যাক অ্যালিস্টার বনাম পেদ্রি-অলমো এবং ইয়ামাল-তাগলিয়াফিকোদের একের পর এক স্নায়ুযুদ্ধের মঞ্চ। এই ছোট ছোট ব্যাটলে যে দল বেশি সফল হবে, শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের শিরোপা সম্ভবত তারাই উঁচিয়ে ধরবে।
সময়ের আলো/এসএকে