‘শত্রু তুমি বন্ধু তুমি/তুমি আমার সাধনা’- বাংলাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মরহুম আব্দুর জব্বার খানের গাওয়া অনবদ্য একটি গান। ১৯৭৯ সালে ‘অনুরাগ’ সিনেমায় গানটিতে কণ্ঠ দেন তিনি। শ্রোতাপ্রিয় এ গানের চরণদ্বয়ের সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলে দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা এবং স্পেনের কিন্তু দারুণ মিল! বিশ্বকাপের মঞ্চে ট্রফির লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আজ দুদল পরস্পরের চরম শত্রু হলেও, তাদের মধ্যে মিত্রতাও কম নয়। কৃষ্টি, কালচার, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এমনকি রাজনৈতিক, কূটনীতিতেও রয়েছে তাদের সুদীর্ঘ ইতিহাস। যা দুই দেশের ভূতপূর্ব ঘটনাকে ফুটবলের মঞ্চে আবারও এনে দাঁড় করিয়েছে।
জুলাই নিঃসন্দেহে আর্জেন্টাইনদের প্রিয় মাসের একটি। তার কারণও যথেষ্ট। এই মাসেই যে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করেছিল। আজ থেকে দুশ বছর আগে। কাদের কাছ থেকে আর্জেন্টিনা স্বাধীনতা লাভ করেছিল, সেই ইতিহাসও অনেকের জানা। তারপরও বলছি, স্পেনের কাছ থেকে। তিনশ বছরের উপনিবেশিকতার শাসন- শোষণ, শৃঙ্খলা ভেঙে ১৮১৬ সালের জুলাইয়ে স্বাধীনতা লাভ করে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। তবে দেশ তুলে দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে দেয়নি স্প্যানিশরা। তার পুনর্গঠনে বিরাট অবদান রাখে স্পেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিজেদের দক্ষ ১৫ লাখের অধিক সুদক্ষ জনগোষ্ঠীকে আর্জেন্টিনায় অভিবাসী হিসেবে প্রেরণ করে। যারা পরবর্তী সময়ে আধুনিক আর্জেন্টিনা গঠনে ভূমিকা রাখেন।
ঔপনিবেশিকতার কারণে আর্জেন্টিনাকে যেমন স্পেনের শাসক, রাজরাজড়াদের অত্যাচার, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে; স্পেন সেই ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখার মধ্যেও দিয়েছে। শত্রু থেকে বন্ধুতা স্থাপনের নজির রেখে। ফুটবলের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। আর্জেন্টিনার অধিকাংশ খেলোয়াড়ের রুটি-রুজির উৎসের বড় জোগানদাতা স্পেনের ক্লাবগুলো। লা-লিগায় খেলেই বড় অঙ্কের টাকা-পয়সার মুখ দেখেছে, নিয়মিত দেখছে আর্জেন্টিনার অনেক মেধাবী দারিদ্র্য-পীড়িত ঘরের ছেলেরা। যার মধ্যে উল্লেখ করার মতো নাম লিওনেল মেসি। এই ঘটনা বিশ্ব ফুটবলে কারোর অজানা নয়। আজকের মেসি স্পেনের বিখ্যাত ক্লাব বার্সেলোনার তৈরি। মেসি যতটা বার্সার, অতটা আর্জেন্টিনার নয়। এই আলোচনা মেসির ক্যারিয়ারে দীর্ঘ সময় ছিল। আর্জেন্টিনাকে ২০২২ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন করার পর থেকে সেই আলোচনায় ছেদ পড়ে।
ফেরা যাক জুলাইয়ে। এই মাসটি সত্যিই আর্জেন্টিনার সৌভাগ্যের মাস। মুদ্রার বিপরীতে থাকা স্পেনের জন্য হতাশার। অন্তত দুদেশের ফুটবল যুদ্ধের পটভূমিতে। আজ থেকে ৬০ বছর আগের ঘটনা। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৬৬ বিশ্বকাপে জুলাইয়ে প্রথমবার বড় মঞ্চে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও স্পেন। বার্মিহ্যামের ভিলা পার্কে গ্রুপপর্বের ওই ম্যাচে ২-১ গোলে জেতে আর্জেন্টিনা। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও দুদল পরস্পরের মুখোমুখি হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপ আবারও তাদের শিরোপার মঞ্চে এনে দাঁড় করিয়েছে এবং কাকতালীয় হলে সত্য সেটা কিন্তু জুলাই মাসেই।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে এক এবং দুইয়ে লড়াই সচরাচর দেখেনি ফুটবল বিশ্ব। আর্জেন্টিনা এবং স্পেন আজ সেই স্বাদ দিতে চলেছে। দুর্দান্ত সব ম্যাচ খেলে ফাইনালে উঠে এসেছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা; স্পেনও ভালো খেলেছে। তবে তাদের ফাইনালের মঞ্চে আসাটা অনেকটা নীরবে-নিভৃতে, কচ্ছপগতিতে। নকআউটের প্রতিটি ম্যাচে মেসিরা যেখানে আলোচনা, সমালোচনা, প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে; সেখানে স্পেন শুরু থেকে ধীরে চলো নীতিতে এগিয়েছে। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে খুব বড় মার্জিনে জয় নয়, হিসাবি জয়ে ফাইনালের মঞ্চে এসেছে। আর্জেন্টিনা যেখানে তাদের অধিনায়ক এবং মহাবিশ্বের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে চলতি আসর শুরু করেছে, সেখানে অখ্যাত আফ্রিকার ছোট্ট দেশ কেপভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে ২০১০ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
স্পেনের বিপক্ষে বিশ্ব আসরে দ্বিতীয়বার খেলতে যাচ্ছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে বিশ্বকাপে কম দেখা হলেও দুদেশের খেলার ইতিহাস কিন্তু সুদীর্ঘ। ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ দিয়ে। সবশেষ দুদল খেলেছে ২০১৮ সালে।
এত বছরে মোট ১৪টি ম্যাচ খেলেছে তারা। তাতে আর্জেন্টিনার ৬ জয়ের বিপরীতে, স্পেনের জয়ও ৬টি। বাকি দুটি ম্যাচ ড্রয়ে নিষ্পত্তি হয়েছে। আজ ফাইনালের মঞ্চে যে জিতবে তারা শুধু ট্রফিটাই জিতবে না, নিজেদের পূর্ব রেকর্ডও এগিয়ে নেবে। মেসিরা চাইবেন ব্যাক টু বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিলের পর ইতিহাস গড়তে। স্পেন চাইবে ১৬ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে দ্বিতীয়বার সোনালি ট্রফিতে চুমো আঁকতে।
স্পেন টিকিটাকা বা ছোট পাসের দল হিসেবে বিশ্ব ফুটবলে পরিচিত, সমাদৃত; প্রথমবার এই কৌশলে খেলে সফলও হয়েছিল দলটি, সেটা ২০১০ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে। যদিও পরে সেই কৌশল মুখ থুবড়ে পড়ে। টানা তিন বিশ্বকাপে ব্যর্থ হওয়া দলটি এবার পুরোনো টিকিটাকার সঙ্গে হাই প্রেসিং ফুটবলের মেলবন্ধনে দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফিরেছে শিরোপার মঞ্চে। স্পেনের ফুটবলাররা শুধু নিজেদের মধ্যে বল দেওয়া-নেওয়াতেই পারদর্শী নয়, এই কৌশলে তারা প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের ক্লান্তও করে তোলে।
দলটির আক্রমণভাগের মুভমেন্টগুলো খুবই গতিশীল; যেখানে খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে পজিশন অদলবদলই করে না, আচমকা এমনভাবে বক্সে ঢুকে পড়ে, যা প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যুহকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। চলতি আসরে দানি ওলমো মিডফিল্ড এবং আক্রমণে স্পেনের অন্যতম সেরা পারফর্মার। মিকেল মেরিনো সুপারসাব হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, ইয়ামাল, রদ্রিরাও দুর্দান্ত খেলছেন। স্পেনের রক্ষণভাগে উইং বা ফুলব্যাক পজিশন থেকে আক্রমণভাগে খেলোয়াড়দের ওভারল্যাপ বা আকস্মিক দৌড় দলটির জন্য বিশেষভাবে ফলপ্রসূ হয়েছে। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে পেদ্রো পোরোর গোলটি ঠিক এই পথেই এসেছিল।
বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে স্পেনের জুড়িমেলাভার। কোচ দে লা ফুয়েন্তের ফরোয়ার্ডরা আক্রমণাত্মকভাবে প্রেস করে খেলে, অন্যদিকে সেন্টার-ব্যাক পাউ কুবারসি এবং আইমেরিক লাপোর্তে রক্ষণভাগকে বেশ উপরের দিকে ধরে রাখেন। ফলে মাঠের জায়গা ছোট হয়ে আসে এবং প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধে চেপে যেতে বাধ্য হয়। দলের এই পুরো কৌশলে কাজ আদায়ে পারদর্শী অধিনায়ক রদ্রি। লুজ বলগুলো দখলে নেওয়া এবং অসাধারণ পজিশনাল সেন্স দিয়ে প্রতিপক্ষের কাউন্টার-অ্যাটাকগুলো নসাৎ করে দেওয়াতে খুব কম সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারই তার সমকক্ষ। এই টুর্নামেন্টে দলের প্রতিটি খেলোয়াড় তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব খুব নিখুঁতভাবে জানেন এবং সতীর্থদের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়াও দুর্দান্ত। তাদের সঙ্গে লামিন ইয়ামালের জাদুকরী প্রতিভার ছন্দ ছোঁয়া যোগ হলে ফাইনালে স্পেনকে পরাস্ত করা আর্জেন্টিনার জন্য একটি বিশাল এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত খেলছে মেসির আর্জেন্টিনা। একসময়ের মেসিনির্ভরতা কাটিয়ে এখন টিম আর্জেন্টিনায় রূপ নিয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার সেরা এ দলটির টিম গেমই এখন টপ অব দ্য ওয়ার্ল্ড। এর জন্য সারা বিশ্বে প্রশংসিতও হচ্ছে কোচ লিওনেল স্কালোনি। টুর্নামেন্টে এবার অন্য যেকোনো দলের চেয়ে মেসিরা তাদের পাসগুলোর খুব ছোট একটি অংশ উইং বা ফ্ল্যাঙ্কের দিকে বাড়িয়েছে। ৩৯ বছর বয়সি মেসি তার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কিংবা তার দল স্পেনের মতো অতটা আগ্রাসী বা ‘হাই প্রেস’ করে খেলতে হয়তো পারবে না। তারা প্রতি ম্যাচে গড়ে ফাইনাল থার্ডে (প্রতিপক্ষের বক্সের কাছাকাছি এলাকায়) মাত্র ২.৯ বার বল কেড়ে নিতে পেরেছে, যা স্পেনের প্রায় অর্ধেক। এর পরিবর্তে, তারা প্রতিপক্ষকে কিছুটা জায়গা দেয় এবং বল মাঝমাঠে আসামাত্রই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
এবারের বিশ্বকাপে কম উচ্চতার দল হওয়া সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা শূন্যে বা হেডের লড়াইয়ে দারুণ সাফল্য পেয়েছে এবং হেড থেকে চারটি গোল করেছে। এর মধ্যে তিনটি গোলই এসেছে মেসির পিন-পয়েন্ট ক্রস থেকে, যার মধ্যে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লাউতারো মার্টিনেজের শেষ মুহূর্তের জয়সূচ গোলটিও রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, তাদের মূল খেলা মাঝ মাঠকেন্দ্রিক হলেও মেসির নিখুঁত ক্রসের কারণে তারা উইং বা দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও সমান বিপজ্জনক।
আক্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু মেসি। তবে মেসি ছাড়াও হুলিয়ান আলভারেজ আক্রমণভাগে দুর্দান্ত এনার্জি ও স্কিল জোগান দিচ্ছেন, এনজো ফার্নান্দেজ শেষ মুহূর্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছেন এবং গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ সবসময়ই আত্মবিশ্বাসী প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দল হিসেবে স্পেন হয়তো কিছুটা বেশি পরিপূর্ণ বা কমপ্লিট, কিন্তু আর্জেন্টিনার রয়েছে এক অক্লান্ত লড়াকু মনোভাব এবং সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এক জাদুকরী ক্ষমতা।
ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতির অঙ্গনে দুদল যেমন পরিচিত, তেমনি ফুটবলের মাঠেও পরস্পর পরস্পরের বেশ আপন। স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা যেমন মেসিকে তৈরি করেছে, তেমনি আরও অনেকের রুটি-রুজির জোগানদাতাও লা-লিগা। এবারের বিশ্বকাপ আসরের কথাই যদি ধরি, দুদলের ৫২ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৪ জনই স্পেনের লিগে খেলে। এর মধ্যে স্পেনের খেলোয়াড় ১৮ জন, ৬ জন আর্জেন্টিনার। এতেই প্রতীয়মান দুদল এবং দুদলের খেলোয়াড়রা পরস্পরের খেলার ধরনেই পরিচিত নয়, সম্পর্কে রয়েছে দারুণ গভীরতাও।
ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, আচরণ কিংবা সংগীতে যতই মিল থাকুক কিংবা ১৯ বছর আগে স্পেনের সময়ের সেরা তারকা লামিন ইয়ামালকে আর্জেন্টাইন জাদুকর মেসি বাথটাবে গোসল করান, সেসব হিসাব কিন্তু আজ ধর্তব্য নয়। আজ মেসির প্রতিপক্ষ ইয়ামাল, আর্জেন্টিনার আলভারেজ, দি পল, এনজো কিংবা এমিলিয়ানো মার্তিনেজের প্রতিপক্ষ স্পেনের রদ্রি, মেরিনো, পেদ্রো পেরোরা । দুদলেরই লক্ষ্য অভিন্ন শিরোপা জয়। চ্যাম্পিয়ন ট্রফি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরা। মেসিরা চাইবে টানা দ্বিতীয়বারের পাশাপাশি চতুর্থবার দেশকে শিরোপা জয়ের স্বাদ দেওয়া। অন্যদিকে স্পেন জিতলে সংখ্যাটা দাঁড়াবে দুইয়ে। সোনালি ট্রফিতে শেষ পর্যন্ত কারা চুমো আঁকে এখন সেদিকেই চোখ বিশ্বের।
সময়ের আলো/এসএকে