২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে টানা ১৬ বছর পর নিজেদের ঘরে ট্রফি তুলল স্পেন। দলের এ ঐতিহাসিক সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেল্লা। বিশ্বকাপ জয় নিঃসন্দেহে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন। তবে কুকুরেল্লার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় জয় কোনো শিরোপা বা পদক নয়। অটিজমে আক্রান্ত ছেলে মাতেওর প্রতিটি ছোট্ট অগ্রগতি, নতুন হাসি, ইতিবাচক পদক্ষেপ তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বিশ্ব ফুটবলে মার্ক কুকুরেল্লা তার লম্বা চুল, আক্রমণাত্মক ট্যাকল, নিরলস পরিশ্রম ও লড়াকু মানসিকতার জন্য পরিচিত। তবে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াইটি ফুটবল মাঠে নয়, বরং পরিবারের ভেতরে। সেই সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু তার ছেলে মাতেও। অল্প বয়সেই অটিজমে আক্রান্ত হয়ে পড়ে মাতেও।
মাত্র ১৩ মাস বয়সে মাতেওর আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন কুকুরেল্লা ও তার সঙ্গী ক্লাউদিয়া। নিজের নাম শুনেও সাড়া না দেওয়া, চোখে চোখ রেখে কথা না বলা-এসব লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর শুরু হয় দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনিশ্চয়তার সময়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন, তাদের ছেলে অটিজমে আক্রান্ত।
সেই সময়ের অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে গিয়ে কুকুরেল্লা এক সাক্ষাৎকারে জানান, প্রতিদিন কান্না করতে করতে তাদের বাড়ি ফিরতে হতো। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তাদের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। এমন এক লড়াই, যেখানে কোনো প্রতিযোগিতা নেই, নেই কোনো ট্রফি, নেই শেষ বাঁশি। আছে শুধু সন্তানের জন্য প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করার অঙ্গীকার।
এই পথচলায় থেরাপি, উপযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজ, নির্ঘুম রাত, হতাশা এবং অনিশ্চয়তা ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। তবে প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে।
কুকুরেল্লার ভাষায়, অটিজমে আক্রান্ত একটি শিশু পৃথিবীকে অন্যদের মতো বোঝে না। তাই প্রথমে অভিভাবকদেরই শিখতে হয় কীভাবে তাকে বুঝতে হবে।
ছেলের বিকাশের জন্য কুকুরেল্লা ও ক্লাউদিয়া নিজেদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছেন। নতুন পরিবেশ, নতুন সুযোগ এবং প্রতিটি ব্যর্থতার পর তা পুনরায় শুরু করার মধ্য দিয়েই তারা এগিয়ে গেছেন। কঠিন সময় তাদের দূরে সরিয়ে দেয়নি, বরং পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে।
কাল যখন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের হয়ে মাঠে নামলো কুকুরেল্লা, তখন তার লক্ষ্য ছিল বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি জেতা। তবে তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো শিরোপা, পদক কিংবা ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়। ছেলে মাতেওর প্রতিটি ছোট্ট অগ্রগতিই তারজীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
একটি নতুন শব্দ উচ্চারণ, চোখে চোখ রেখে তাকানো কিংবা একটি হাসি-এসব মুহূর্তই একজন বাবার কাছে যেকোনো ট্রফির চেয়েও মূল্যবান। ফুটবল তাকে বিশ্বজোড়া পরিচিতি দিয়েছে, কিন্তু একজন বাবা হিসেবে সন্তানের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর প্রতিটি হাসিই তারজীবনের সবচেয়ে বড় জয়।
সময়ের আলো/কেএইচও