জন্ম থেকেই দুই হাতের কব্জি নেই। হাত ছোট ও বাঁকা। অন্য আর দশজনের মতো স্বাভাবিক নয় তার জীবন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর অভাব-অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা তার। তবুও পড়ালেখা ছাড়েনি সে। বরং অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর স্বপ্ন পূরণের প্রবল আশা তাকে পৌঁছে দিয়েছে উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষার চূড়ায়। তার নাম কলি রানী। এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে কলি রানী।
সে কাউনিয়া কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে পা দিয়ে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছে সে। কলি রানী কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নে গদাই গ্রামের রুপালী রানীর মেয়ে। দুই পায়ে হাঁটাচলা করতে পারলেও বাহু থেকে দুই হাতের কব্জি নেই। কিন্তু প্রতিবন্ধকতা তাকে দমাতে পারেনি।
সরেজমিন দেখা যায়, কাউনিয়া মহিলা কলেজ পরীক্ষাকেন্দ্রে সবাই যখন বেঞ্চে বসে একমনে প্রশ্নের উত্তর লিখে যাচ্ছে খাতায়, তখন তাদেরই পাশে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে কলি রানী। তাকে দেওয়া হয়েছে ছোট বেঞ্চ। আর সেখানে বসে মনোযোগসহকারে পা দিয়ে উত্তরপত্রে লিখছে সে।
কলি রানী জানা, অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন তার। পড়ালেখা শিখে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখে। বাবার শূন্যতা আর সংসারের অভাব মোচনে নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বাধা মনে হলেও ইচ্ছাশক্তিটাই বড় অনুপ্রেরণা জুুগিয়েছে।
কাউনিয়া মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, পরীক্ষা কক্ষে অন্যদের সঙ্গে কলি রানী পা দিয়ে খাতায় লিখছে। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় কেন্দ্রের নিয়ম মেনে তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণে তার এই স্বপ্নের পথচলায় সফলতা কামনা করি।
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কলি রানীকে দমাতে পারেনি। তার ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও সাহস অন্যদের অনুপ্রেরণার বার্তা দেয়। আমরা চাই তার অদম্য অগ্রযাত্রা যেন থেমে না যায়। সে যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। উপজেলা প্রশাসন কলি রানীর পাশে থাকবে। কলি রানী যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে তখনই বাবা মনোরঞ্জন রায় পরলোকগমন করেন। পরিবারে ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট কলি রানী।
পড়ালেখার প্রতি প্রবল আগ্রহ আর মনের জোরে কারও সহযোগিতা ছাড়াই সে পা দিয়ে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছে। পরিবারের সহযোগিতা আর প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে কলি রানী। পঞ্চম শ্রেণিতে সে পায়ে লিখে ‘এ’ গ্রেড পেয়েছিল। এসএসসিতেও উত্তীর্ণ হয়েছে কৃতিত্বের সঙ্গে। পা দিয়ে চালাতে পারে কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন। বাবাহীন পরিবারের হাল ধরতে তার স্বপ্ন পড়ালেখা শিখে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। সে ভালো গানও গাইতে পারে। গান গেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক পুরস্কারও পেয়েছে।
কলি রানীর ভাই মন্টু জানান, জন্ম থেকেই তার বোনের হাতের কব্জি নেই। হাত বাঁকা ও ছোট। এ কারণে অন্যদের মতো হাত দিয়ে কলম ধরতে পারে না। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ় মনোবলে ভর করে কলি রানী ডান পা দিয়ে লেখা শুরু করে। একপর্যায়ে দ্রুতগতিতে লেখার কৌশল আয়ত্ত করে। তিনি ছোট বোনের স্বপ্নপূরণের জন্য সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের কাছে সহযোগিতা কামনা করেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি