নড়াইল জেলার প্রবেশমুখে যশোর-অভয়নগরের সীমান্ত ছাড়িয়ে বর্নিবাজার এলাকায় বড় বড় অক্ষরে লেখা একটি সাইনবোর্ড পথচারীদের স্বাগত জানায়। তাতে লেখা রয়েছে, স্বাগতম, ভিক্ষুকমুক্ত নড়াইল জেলা। কিন্তু সাইনবোর্ডের ধূলিমলিন অক্ষরের আড়ালে যে জীবনগুলো দাঁড়িয়ে আছে, তাদের গল্পটা বড্ড ভিন্ন। জেলা শহরের ব্যস্ত সড়ক, বাস টার্মিনাল, রূপগঞ্জ বাজার কিংবা সরকারি দফতরগুলোর সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায় ভিক্ষুকমুক্ত করার সরকারি বার্তাটি এখন মূলত ওই সাইনবোর্ডেই বন্দি।
২০১৭ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অত্যন্ত আশাজাগানিয়া একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ৩৯টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০০ জন অসহায় মানুষকে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল গরু, ছাগল, সেলাই মেশিন, ভ্যান কিংবা ছোট দোকানের মতো জীবিকার অবলম্বন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই- তাদের হাতে ভিক্ষার ঝুলির বদলে আয়ের স্বাধীন পথ তুলে দেওয়া। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই উদ্যোগের ছন্দপতন ঘটেছে। পেটের ক্ষুধা ও জীবনযুদ্ধের নির্মম বাস্তবতায় পুনর্বাসিতদের অনেকেই আবার ফিরে এসেছেন সেই চেনাপথে।
রূপগঞ্জ বাজারে হুইলচেয়ারে কিংবা লাঠিতে ভর দিয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলোর চোখে চোখ রাখলে ফুটে ওঠে বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি। মির্জাপুর গ্রামের প্রবীণ শাজাহান কিংবা কলোড়া গ্রামের সুখরানিদের গল্পগুলো প্রায় একই সুতোয় গাঁথা। সরকারি পুনর্বাসন কিংবা যে ভাতা তারা পান, তা দিয়ে চড়া বাজারের এই সময়ে সংসার চালানো তো দূরের কথা, অসুস্থ থাকা পরিবারের সদস্যদের ওষুধ আর এক বেলা পেট ভরে খাওয়ার সংস্থানও হয় না। ছলছল চোখে সুখরানি বলছিলেন, সরকারি ভাতায় সংসার চলে না বাছা। স্বামী অসুস্থ, চিকিৎসার খরচ জোগাব নাকি পেটে ভাত দেব? বাধ্য হয়েই আবার রাস্তায় নামতে হয়েছে।
অনেকেরই অভিযোগ, সেই সময়ে প্রাপ্ত সহায়তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তীব্র অভাবের তাড়নায় কেউ কেউ পুনর্বাসনের সেই হাঁস-মুরগি বা ক্ষুদ্র সহায়তার উপাদান বিক্রি করে বাধ্য হয়েছেন সাময়িক ক্ষুধা মেটাতে। নড়াইলে ভিক্ষাবৃত্তি না কমার পেছনে আরেকটি মানবিক অথচ জটিল কারণ রয়েছে প্রতিবেশী জেলাগুলো থেকে আসা অসহায় মানুষের আগমন।
সদর উপজেলা সমাজসেবা অফিসের সামনে দেখা হয় যশোর থেকে আসা প্রতিবন্ধী আব্দুস সালামের সঙ্গে। নড়াইলে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি খুব সাধারণ গলায় জীবনের এক অমলিন সত্য তুলে ধরে বলেন, নিজের এলাকায় পরিচিতদের কাছে হাত পাততে লজ্জা লাগে, কেউ দেয়ও না। নড়াইলের মানুষ একটু নমনীয়, তাই কষ্ট করে সকালে বাসে চেপে এখানে আসি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যে জানা যায়, প্রতি হাটের দিনে পাশের জেলার ধলগাঁ বা আশপাশের এলাকা থেকে একদল মানুষ জীবনধারণের তাগিদে দলবেঁধে এখানে আসে। দিনশেষে আবার ফিরে যান নিজেদের ঠিকানায়। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সাময়িক বিরক্তি প্রকাশ করলেও এ দৃশ্যের পেছনের সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা আর দারিদ্র্যের চিত্রটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
স্থানীয়রা বলছেন, কেবল সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে কিংবা এককালীন কিছু সামগ্রী দান করে কোনো অঞ্চলকে সম্পূর্ণ ভিক্ষুকমুক্ত করা সম্ভব নয়, নড়াইলের বর্তমান পরিস্থিতি সেই শিক্ষাটাই দিচ্ছে। সমাজসেবা অধিদফতরের পক্ষ থেকে নজরদারি ও সহায়তার ধারাবাহিকতার কথা বলা হলেও, বাস্তবে প্রয়োজন আরও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ।
সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা উত্তম সরকার বলেন, ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে আমাদের কাজ চলমান। বাইরের জেলা থেকে লোক আসায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হচ্ছে, তবে আমরা স্থানীয়দের পুনর্বাসন টেকসই করার চেষ্টা করছি।
নড়াইল জেলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মোস্তফা কামাল মনে করেন, ভিক্ষাবৃত্তি কেবল কোনো অপরাধ বা সামাজিক ব্যাধি নয়, এটি মূলত চরম দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের এক করুণ বহিপ্রকাশ। তাই নড়াইলকে সত্যিকার অর্থে ভিক্ষুকমুক্ত করতে প্রয়োজন কেবল কাগুজে ঘোষণা নয়; বরং প্রয়োজন সার্বক্ষণিক তদারকি, পর্যাপ্ত ভাতা প্রদান এবং এই প্রান্তিক মানুষগুলোর প্রতি সমাজ ও সরকারের একটি টেকসই, পরম মমতাময় সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি