মামলার নথি পাঠিয়ে টাকা দাবির অভিযোগ, লেনদেন হয় বিকাশে তবুও আসামি যুবলীগ নেতা

রাহাদ সুমন

সারাদেশ

দেশব্যাপী আলোচিত বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় প্রকাশ্যে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের মামলা নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে এসেছে।

2026-07-21T14:13:42+00:00
2026-07-21T14:23:55+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
মামলার নথি পাঠিয়ে টাকা দাবির অভিযোগ, লেনদেন হয় বিকাশে তবুও আসামি যুবলীগ নেতা
রাহাদ সুমন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ২:১৩ পিএম  আপডেট: ২১.০৭.২০২৬ ২:২৩ পিএম
আগৈলঝাড়া থানায় পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনায় আসামি করা হয়েছে যুবলীগ নেতাকে। ছবি : সময়ের আলো
দেশব্যাপী আলোচিত বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় প্রকাশ্যে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের মামলা নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। মামলায় আসামি করা হবে না জানিয়ে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হলে, পরবর্তীতে বিকাশের মাধ্যমে ১৯ হাজার টাকা নিয়েও আসামি করা হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতাকে। একই মামলায় আরও একজন যুবলীগ নেতাকে আসামি করা হয়। বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের কিছু প্রমাণও এসেছে সাংবাদিকদের কাছে।

থানার পরিদর্শকের (তদন্ত) নাম ব্যবহার করে, হামলা-ভাঙচুরের মামলার বাদি উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুকের পরিচয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ওই টাকা। তবে, যেই নম্বর থেকে ফোন করে টাকা দাবি এবং বিকাশে লেনদেন করা হয়েছে, দুটি নাম্বারই এখন বন্ধ রয়েছে। পুলিশ বলছে, বন্ধ থাকা নাম্বার দুটি নীলফামারী এলাকার বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

সূত্রমতে, গত ৯ জুলাই মাদক ও চুরি মামলায় গ্রেফতারকৃত সন্ধিগ্ধ আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে প্রকাশ্যে মিছিল নিয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা-ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধর করে থানার পার্শ্ববর্তী ফুলশ্রী গ্রামের বাসিন্দা গ্রেফতারকৃত রিয়াজ ফকিরের স্বজনরা। পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এফএম নাজমুল রিপন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি কামরুজ্জামান আজাদ সেরনিয়াবাত ও জেলা যুবলীগ নেতা মাহমুদুল ইসলাম সাগর সেরনিয়াবাতকে উসকানিদাতা হিসেবে আসামি করা হয়েছে। মামলায় ৪৩ জনের নাম উল্লেখ করে আরও প্রায় ৩০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।


আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুক বাদি হয়ে দায়ের করা মামলায় ২৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ বরিশাল জেলা যুবলীগের সদস্য উপজেলার সেরাল গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদুল ইসলাম সাগর সেরনিয়াবাতকে।

মাহমুদুল ইসলাম সাগর সেরনিয়াবাত অভিযোগ করে বলেন, ‘থানায় ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার মামলায় আমাকে উদ্দেশ্যেমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে। থানায় মামলার আবেদন জমা দেওয়ার পর ওসি স্বাক্ষর দেওয়ার আগেই একটা নাম্বার থেকে আমার কাছে ৯ জুলাই ফোন আসে। তখন ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি নিজেকে মামলার বাদী এবং আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওমর ফারুক পরিচয় দিয়ে জানায় মামলায় আমাকেও আসামি করা হচ্ছে। তাই নাম কাটাতে হলে ১০ মিনিটের মধ্যে ৪০ হাজার টাকা পুলিশ পরিদর্শকের (তদন্ত) কাছে পাঠাতে হবে।’

সাগর সেরনিয়াবাত বলেন, ‘আমি বিষয়টিকে প্রথমে প্রতারণা হিসেবেই ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস অর্জনের জন্য পরবর্তীতে আরেকটি নাম্বার থেকে আমাকে কল দিয়ে ওসি তদন্ত পরিচয় দেয় এবং আমার সঙ্গে কথা বলেন। এমনকি আমার সন্দেহ দূর করার জন্য স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম মারুফ ও সাবেক ইউপি সদস্য বাদল সেরনিয়াবাতের মোবাইলে ফোন করে কনফারেন্সে আমার সঙ্গে কথা বলেন।’

সাগর সেরনিয়াবাত আরও অভিযোগ করেন, এসআই এবং ওসি তদন্তের পরিচয় শনাক্তের পর শুরু হয় দরকষাকষি। মামলা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে প্রথমে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হলেও পরে ১৯ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। এরপর সেই নাম্বারে দুইবারে ১৫ হাজার ৫ টাকা এবং ৪ হাজার ৫ টাকা করে মোট ১৯ হাজার ১০ টাকা পাঠানো হয়।


তিনি আরও বলেন, ‘গত ১০ জুলাই মামলাটি থানায় এজাহারভুক্ত হওয়ার পর জানতে পারি আমাকে এবং উপজেলা যুবলীগের সভাপতি কামরুজ্জামান আজাদ সেরনিয়াবাতকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। পরে টাকা পাঠানোর নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।’

সাগর সেরনিয়াবাত অভিযোগ করে বলেন, ‘এজাহারে ওসির স্বাক্ষর হওয়ার পূর্বে সেই অভিযোগের কপি পুলিশ সদস্য ছাড়া বাইরের কারও জানার কথা নয়। আমার ধারণা, মামলার বাদি এবং ওসি তদন্ত এই কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসহ বিচার দাবি করছি। থানায় ভাঙচুরের ঘটনার সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে, প্রশাসন যে শাস্তি দিবে আমি তা মাথা পেতে নেব।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মামলার বাদী আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুক বলেন, ‘আমার নাম ভাঙিয়ে কেউ প্রতারণা করতে পারে। ওই ব্যক্তির (সাগর) সঙ্গে অদ্যাবধি আমার কোনো কথা হয়নি।’

অন্যদিকে ইউপি সদস্য মারুফ সেরনিয়াবাত বলেন, ‘সাগর আমার ভাগ্নে। থানার ওসি আমাকে ফোন করে জানিয়েছিল, সাগর থানা ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত। আমি তাকে বলেছি, ঘটনার সময় সাগর আমার সঙ্গেই ছিল। এরপর ওসি ফোনের সংযোগ কেটে দেন। এর কিছুক্ষণ পরে আবার ওসি ফোন করে জানতে চান, কে কে আমার এলাকা থেকে থানায় ভাঙচুর করতে গিয়েছিল। আমি তাদের বলেছি, এখান থেকে কেউ যায়নি, আপনারা ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। এছাড়া, লেনদেনের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। সাগর আলাদাভাবে যদি লেনদেন করে থাকে, সেটা আমার জানা নেই।’


সাবেক ইউপি সদস্য বাদল সেরনিয়াবাত বলেন, ‘এমন কোনো ঘটনার সাক্ষী আমি নই। এ বিষয় নিয়ে পুলিশ বা আসামি কারোর সঙ্গেই আমার আলোচনা হয়নি।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আগৈলঝাড়া থানার ওসি মোহাম্মদ মাসুদ খানকে তার সরকারি মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন করা হলেও, ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

আগৈলঝাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সুশংকর মল্লিক বলেন, ‘বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে আমি জেনেছি। যেই নম্বর থেকে লেনদেন এবং যোগাযোগ করা হয়েছে, সেই নাম্বার দুটি আমরা ট্রেস করেছি। নাম্বার দুটির লোকেশন নীলফামারী দেখা গেছে। তবে, দুটি নাম্বারই বন্ধ পাওয়া গেছে।’

তিনি বলেন, ‘হতে পারে প্রতারকরা আমাদের নাম ব্যবহার করে এমন কাজ করেছে।’

এজাহারভুক্ত হওয়ার আগে মামলার আবেদন বাইরে যাওয়ার সুযোগ আছে কিনা- এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, ‘মামলা আদালতে যাওয়ার আগপর্যন্ত নথি বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিভাবে যে এটা হলো, বুঝতে পারছি না।’

অন্যদিকে, যুবলীগ নেতার কাছ থেকে টাকা আদায়ে ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারটি কার বা কোথা থেকে সিম দুটি ক্রয় করা হয়েছে তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে, একটি ট্রু কলার মোবাইল অ্যাপে নাম্বারটি সার্চ দিলে সেখানে ‘এসআই চরফ্যাশন’ লেখা আসে।

তবে, এমন ঘটনা জানা নেই দাবি করে বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার এজেডএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এমন কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। যিনি এমন অভিযোগ করেছেন তাকে আমার কাছে অথবা থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। তদন্ত করে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

উল্লেখ্য, দেশব্যাপী আলোচিত এ মামলায় ইতোমধ্যে পুলিশ এজাহারভুক্ত প্রধান আসামিসহ ২৯ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করেছেন।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   মামলা  অভিযোগ  লেনদেন  আসামি  যুবলীগ  বরিশাল  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: