নামহীন কবরের বাসিন্দা বাড়ছে

আদিল সরকার

জাতীয়

কেউ খুঁজতে আসে না। কোনো স্বজন নেই, নেই দাবিদার। মর্গের শীতল ড্রয়ারে দিনের পর দিন অপেক্ষার পর একসময় তারা হয়ে

2026-07-22T02:31:26+00:00
2026-07-22T02:31:26+00:00
 
  বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬,
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
নামহীন কবরের বাসিন্দা বাড়ছে
আদিল সরকার
প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ২:৩১ এএম 
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের বেওয়ারিশ লাশবাহী গাড়ি। সংগৃহীত ছবি
কেউ খুঁজতে আসে না। কোনো স্বজন নেই, নেই দাবিদার। মর্গের শীতল ড্রয়ারে দিনের পর দিন অপেক্ষার পর একসময় তারা হয়ে যায় ‘বেওয়ারিশ’ একটি শব্দ, যা মুছে দেয় নাম, পরিচয়, সম্পর্ক আর জীবনের সব গল্প। কোথাও হয়তো এখনও কোনো মা সন্তানের ফেরার অপেক্ষায়, কোনো সন্তান বাবার খোঁজে, কিংবা কোনো স্বজন নিখোঁজের ডায়েরি বুকে নিয়ে দিন গুনছেন। অথচ সেই মানুষটির শেষ ঠিকানা হয়ে গেছে রাজধানীর একটি নামহীন কবর। 

ঢাকায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এমন বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা। এর পেছনে যেমন রয়েছে দুর্ঘটনা ও ভাসমান মানুষের মৃত্যু, তেমনি রয়েছে হত্যাকাণ্ডের শিকার অসংখ্য পরিচয়হীন মানুষের নিঃশব্দ পরিণতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত তথ্যভান্ডার, আধুনিক ডিএনএ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাবে বহু মরদেহ আজও স্বজনদের কাছে ফিরতে পারছে না।

সবশেষ গত জুন মাসে ঢাকায় দাফন করা হয়েছে অন্তত ৬৭টি বেওয়ারিশ মরদেহ, যেগুলোর কোনো স্বজন বা দাবিদার খুঁজে পাওয়া যায়নি। গত চার বছরের মধ্যে একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই রাজধানীতে তিন শতাধিক বেওয়ারিশ মরদেহ পাওয়া গেছে।

এসবের মধ্যে দুর্ঘটনায় নিহত ও ভাসমান মানুষের পাশাপাশি রয়েছে হত্যাকাণ্ডের শিকার অনেক ব্যক্তির মরদেহও। হত্যার পর প্রমাণ গোপনের উদ্দেশ্যে অনেক সময় মরদেহ নদীতে বা রেললাইনে ফেলে দেওয়া হয়। পরে সেগুলো উদ্ধার হলেও পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় এবং স্বজনের সন্ধান না মেলায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় ডাটাবেজ, আধুনিক ডিএনএ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, হাসপাতাল-মর্গ-পুলিশের সমন্বিত তথ্যভান্ডার এবং দ্রুত পরিচয় শনাক্তের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় দিন দিন বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে বেওয়ারিশ মরদেহ ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও।

রাজধানীতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমন, সড়ক দুর্ঘটনা, অপরাধ, অজ্ঞাত পরিচয়ের মানুষের মৃত্যু, ভবঘুরে ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক সময় স্বজনরা খোঁজ না নেওয়া বা পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় মরদেহ দীর্ঘ সময় মর্গে পড়ে থাকে। পরে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সেগুলো রাজধানীতে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের দায়িত্বে থাকা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংস্থাটি মুসলিমদের মরদেহ রায়েরবাগ ও জুরাইন কবরস্থানে দাফন করে এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে পোস্তগোলা শ্মশানে।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সংস্থাটি মোট ৬৪৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করেছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫৭০টি এবং তার আগের বছর ছিল ৪৯০টি। অর্থাৎ গত সাড়ে তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের জুলাই মাসে। ওই মাসে দাফন করা হয়েছিল ৮১টি বেওয়ারিশ মরদেহ।

জানা যায়, প্রতিটি মরদেহ দাফনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। অনেক মরদেহের পরিচয় পাওয়া যায় না, আবার অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও স্বজনরা এগিয়ে আসেন না। তখন মানবিক দায়িত্ব থেকেই সেসব মরদেহের দাফনের ব্যবস্থা করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। 

বেওয়ারিশ মরদেহ হস্তান্তরের সময় পুলিশ সংস্থাটিকে মরদেহের একটি ছবি, সুরতহাল প্রতিবেদন এবং মৃত্যু সনদ (ডেথ সার্টিফিকেট) সরবরাহ করে। এরপর দাফনের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, সংস্থাটির কাছে এসব মরদেহের কোনো ডিএনএ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিজিটাল ডাটাবেজ সংরক্ষণ করা হয় না এবং তাদের কার্যক্রমে এর প্রয়োজনও পড়ে না। তবে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম, সিটি করপোরেশন এবং কবরস্থান বা শ্মশান কর্তৃপক্ষ- এই চারটি পর্যায়ে তথ্য সংরক্ষণ করা হয়।

এদিকে বেওয়ারিশ মরদেহের একটি বড় অংশই হত্যাকাণ্ডের শিকার। হত্যার প্রমাণ গোপন করতে অনেক সময় মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এতে মরদেহ পচে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রাণী দেহের অংশবিশেষ খেয়ে ফেলায় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। নৌ পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নদী থেকে অন্তত ৪৪০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ১৪১ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

একইভাবে হত্যার প্রমাণ গোপনের উদ্দেশ্যে অনেক সময় মরদেহ রেললাইনে ফেলে রাখা হয়। রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরে ঢাকা জেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৭৬৩ জন। রেলওয়ের ঢাকা জেলার আওতায় রয়েছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জ। এ ছাড়া সারা দেশে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটনাই ঘটে এই অঞ্চলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেওয়ারিশ মরদেহও রয়েছে।

আরেকটি তথ্যমতে, গত বছর রাজধানীসহ সারা দেশের থানাগুলোতে দৈনিক গড়ে ৮৩টি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৮৩টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিনটি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে থেকে যাচ্ছে। ফলে বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সচেতন নাগরিকরা।

বেওয়ারিশ মরদেহের বিষয়ে জানতে চাইলে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন সেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘যেসব মরদেহের কোনো স্বজন পাওয়া যায় না সেগুলো পুলিশের ক্লিয়ারেন্সের পর আমাদের কাছে পাঠানো হয়। আমরা শুধু মরদেহ বহন ও দাফনের কাজ করি। কে, কীভাবে মারা গেছেন কিংবা মৃত্যুর তদন্ত সংক্রান্ত সব নথি পুলিশের কাছেই থাকে। ফলে পরবর্তী সময়ে কোনো প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের পুলিশের সঙ্গেই যোগাযোগ করতে হয়।’

তিনি বলেন, দাফনের পর অনেক সময় স্বজনরা এসে খোঁজ করেন। তখন আমরা শুধু জানিয়ে দিই মরদেহটি কোথায় দাফন করা হয়েছে। এরপর সেখানে গিয়ে দোয়া করা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার থাকে না।

সংস্থাটির আওতাধীন কবরস্থান বা শ্মশানে বিদেশি কোনো বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয় কি না জানতে চাইলে কামরুল আহমেদ বলেন, ‘সাধারণত কেউ কারাগারে মারা গেলে আদালতের নির্দেশ পেলে আমরা সেই মরদেহ দাফন করি। সবশেষ একজন ভারতীয় ও একজন ফিলিস্তিনির মরদেহ এভাবেই দাফন করা হয়েছে। এ ছাড়া শিশুমনি নিবাসে পালিত কোনো শিশুর মৃত্যু হলেও আদালতের অনুমতি লাগে।’

রাজধানীর কোন এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি বেওয়ারিশ মরদেহ আসে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা থেকেই সবচেয়ে বেশি আসে। এ এলাকায় হাসপাতালের সংখ্যা বেশি হওয়ায় মরদেহও বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং এ অঞ্চলের বিভিন্ন থানা থেকে সবচেয়ে বেশি বেওয়ারিশ মরদেহ আসে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী সময়ের আলোকে বলেন, ‘অনেক সময় নদী থেকে এমন মরদেহ উদ্ধার হয়, যা পচে যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ নেওয়ার অংশটুকুও মাছ খেয়ে ফেলে। তখন আমরা ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করি। 

এ ছাড়া যেকোনো মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত করা হয়। সেখানে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই হত্যা মামলা রুজু করা হয়। পরে সুরতহালসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ করে মরদেহ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কারণ দীর্ঘদিন এত মরদেহ সংরক্ষণের সুযোগ থাকে না।’

তিনি আরও জানান, বর্তমানে সারা দেশে সিআইডির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ পরীক্ষাগার কেবল রাজধানীতেই রয়েছে। তবে বেওয়ারিশ মরদেহ শনাক্তে পুলিশের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা রয়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি নগরজীবনের সামাজিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতারও প্রতিফলন। পরিচয়হীন মৃত্যুর পেছনে কী কারণ রয়েছে, কতগুলো স্বাভাবিক মৃত্যু, কতগুলো দুর্ঘটনা কিংবা অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট- এসব বিষয়ে আরও সমন্বিত তদন্ত ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন। 

তাদের মতে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় ডাটাবেজ, আধুনিক ডিএনএ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, হাসপাতাল-মর্গ-পুলিশের সমন্বিত তথ্যভান্ডার এবং দ্রুত পরিচয় শনাক্তের ব্যবস্থা চালু করা গেলে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া অনেক মরদেহই স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। অন্যথায় রাজধানীতে পরিচয়হীন মৃত্যুর এই নীরব পরিসংখ্যান আরও বাড়তে থাকবে।


রাজধানীতে বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা বৃদ্ধিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির সময়ের আলোকে বলেন, ‘বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা বৃদ্ধি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, সামাজিক সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু মরদেহ উদ্ধার বা ময়নাতদন্তে শেষ হয় না। মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত, স্বজনদের খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা এবং মর্যাদার সঙ্গে দাফন বা সৎকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।’

তিনি বলেন, বেওয়ারিশ মরদেহের পরিচয় শনাক্ত বাড়াতে নিখোঁজ ব্যক্তি ও অজ্ঞাত লাশের একটি সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ, আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত তদন্ত এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা যেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো মানুষ যেন পরিচয়হীন অবস্থায় হারিয়ে না যায় এবং কোনো পরিবার যেন তাদের স্বজনের খোঁজে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় না থাকে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 



  বিষয়:   নামহীন কবর  বাসিন্দা  বাড়ছে  ঢাকা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: