নির্মাণসামগ্রীর দখলে শিশুদের খেলার মাঠ

মেহেদী হাসান লিটন, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

সারাদেশ

শিশুদের খেলাধুলা, প্রাত্যহিক সমাবেশ (অ্যাসেম্বলি) ও স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম অবলম্বন একটি বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। অথচ সেই মাঠই যখন নির্মাণসামগ্রীর

2026-07-22T05:40:49+00:00
2026-07-22T05:40:49+00:00
 
  বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬,
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
নির্মাণসামগ্রীর দখলে শিশুদের খেলার মাঠ
মেহেদী হাসান লিটন, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৫:৪০ এএম 
বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে নির্মাণসামগ্রী। ছবি : সময়ের আলো
শিশুদের খেলাধুলা, প্রাত্যহিক সমাবেশ (অ্যাসেম্বলি) ও স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম অবলম্বন একটি বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। অথচ সেই মাঠই যখন নির্মাণসামগ্রীর স্তূপে পরিণত হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ৪ নম্বর নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক এমনই একটি ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

বিদ্যালয়ের মাঠজুড়ে ইট, বালু ও নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখায় প্রায় ১৮০ শিক্ষার্থীর খেলাধুলা বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত অ্যাসেম্বলি, খেলাধুলা ও পাঠদান কার্যক্রম।

অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়সংলগ্ন আলমা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড তাদের সীমানাপ্রাচীর (বাউন্ডারি ওয়াল) নির্মাণের জন্য বিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহার করছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধেও মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। 

সরেজমিন দেখা যায়, ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টির মাঠের বড় একটি অংশজুড়ে ইট, বালু ও নির্মাণসামগ্রী স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ভারী ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন চলাচলের কারণে মাঠের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও কাদা জমে গেছে এবং মাঠটি চলাচলেরও অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা যেমন খেলাধুলা করতে পারছে না, তেমনি প্রতিদিনের অ্যাসেম্বলি ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে আলমা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের জিএম (অ্যাডমিন) শাহেদ হাসান মুরসালীন বলেন, বিদ্যালয়ের জমিদাতা পরিবারের সদস্য অ্যাডভোকেট মনির হোসেনের অনুমতি নিয়েই সাময়িকভাবে মাঠে নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়েছে যাতে বাউন্ডারি ওয়ালের নির্মাণকাজ করা যায়। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট মনির হোসেন দাবি করেন, কোম্পানির কাছ থেকে এক কোটি টাকা এনে বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি নির্মাণ করছি। একপর্যায়ে তিনি উত্তেজিত আচরণ করেন এবং ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। 

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহনাজ বেগম প্রথমে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে দাবি করলেও পরে তিনি বলেন, কারখানার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ হলে বিদ্যালয়েরও কিছু সুবিধা হবে। তবে তার এই বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, কোনো সম্ভাব্য সুবিধার কথা বলে সরকারি বিদ্যালয়ের মাঠ নষ্ট করার সুযোগ দেওয়া দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না। 

শ্রীপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফাতেমা নাসরিন বলেন, বিষয়টি ইতিমধ্যে আমাদের নজরে এসেছে। প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের মাঠে নির্মাণসামগ্রী রাখার অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন না। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসনও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।

 শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাহিদ ভূঞা বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ দখল করে বা শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ হাসিল করতে দেওয়া হবে না। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

সোমবার বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদ নিয়াজ শিশির। পরিদর্শনকালে তিনি দেখতে পান, সরকারি জমির সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ (ডিমার্কেশন) ছাড়াই কারখানার বাউন্ডারি নির্মাণের কাজ চলছিল। এতে সরকারি জমি দখলের আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে সব নির্মাণসামগ্রী অপসারণ করে মাঠকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ প্রদান করেন। 

প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে, সরকারি জমির সীমানা নির্ধারণ না করেই মাঠ ব্যবহার করে নির্মাণকাজ পরিচালনার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে উপজেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে আপাতত বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. রাহাতের কথায়, বেশ কয়েকদিন ধরে মাঠে ইট-বালু ফেলে রাখা হয়েছে। আমরা আর খেলতে পারছি না। টিফিনের সময় মাঠে নামার সুযোগও নেই। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফ জানায়, মাঠে ছড়িয়ে থাকা ইটের কারণে হাঁটতে গিয়ে অনেকেই আঘাত পাচ্ছে। খেলাধুলা তো দূরের কথা, ঠিকমতো চলাফেরাও করা যাচ্ছে না।


স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা জানান, একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলার মাঠের বিকল্প নেই। সরকারি বিদ্যালয়ের মাঠ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্মাণসামগ্রী রাখার স্থান হতে পারে না। এটি শুধু নিয়মবহির্ভূতই নয়, শিশুদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করারও শামিল।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু মাঠ থেকে নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। ভবিষ্যতে যেন সরকারি বিদ্যালয়ের মাঠ আর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ব্যবহার করা না যায়, সে জন্য সরকারি জমির স্থায়ী সীমানা নির্ধারণ, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং শিশুদের নিরাপদ খেলাধুলার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 



  বিষয়:   নির্মাণসামগ্রী  দখল  শিশু  খেলার মাঠ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: