বাংলাদেশ ফিফা বিশ্বকাপে কখনো খেলার সুযোগ পায়নি। এবারও খেলেনি। ভবিষ্যতে কোনো এক দিন খেলবে বলে মনের গভীরে আশা পোষণ করি। বিশ্বকাপে না খেললেও বিশ্বকাপের আসর শুরু হলে ফুটবল উন্মাদনায় ভেসে যায় পুরো দেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন দলের সমর্থকদের জার্সি পরিহিত ছবির সমারোহ দেখা যায়। জার্সি ও পতাকা বিক্রির ব্যবসা জমে ওঠে। ঘরের টিভিপর্দা ছাপিয়ে পাড়া-মহল্লার মোড়ে মোড়ে বড়পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন চলে। বাসার ছাদে শোভা পায় প্রিয় দল ও দেশের জাতীয় পতাকা। গ্রামাঞ্চলে গাছের ডালে ডালে টানাতে দেখা যায় সমর্র্থিত দেশের জাতীয় পতাকা। এবারও এর কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায়নি।
এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল খেলাকে ঘিরে উন্মাদনায় মেতেছিল বাংলাদেশ। ৪৮টি দেশ, ৩টি স্বাগতিক দেশ নিয়ে এই আয়োজন যেন ৩টি মহাদেশেরই আয়োজন। এটি শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়; এটি যেন ৯০ মিনিটকে কেন্দ্র করে সারা দিনের কথামালার আয়োজন। এ আয়োজনে শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ- সবারই সমান আবেগ প্রকাশ পেতে দেখা যায়।
রাস্তাঘাটে, অফিস-আদালতে, চা স্টলে সর্বত্রই ঘুরেফিরে আসে ফুটবলের আলাপ। প্রিয় দল ও প্রিয় খেলোয়াড়ের ক্রীড়া নৈপুণ্য বিশ্লেষণ করা হয় নানা আঙ্গিকে। কখনো কখনো এসব আলাপে উত্তেজনা ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে দেখা যায়। জমি বিক্রি করে বিশালায়তনের পতাকা তৈরির নজির আছে এ দেশে। এই আবেগ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি এই খেলায় বড় অঙ্কের আর্থিক সংযোগ থাকে। দেশের অর্ধেক মানুষ যদি গড়ে দুটি করে জার্সি কেনে তা হলে প্রায় ২০ কোটি জার্সির একটি বাজার সৃষ্টি হয়।
প্রতিটি জার্সি গড়ে ২০০ টাকা করে বিক্রি হলে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি লেনদেন ঘটে। স্বল্প সময়ের এই লেনদেনে দেশের অর্থনীতির ওপর একটি প্রভাব পড়ে। পতাকা তৈরি ও বিক্রির বিষয়টিও একটি বড় বাণিজ্যিক ব্যাপার হয়ে ওঠে। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট পরিবারের সংখ্যা ৪ কোটি ১ লাখ ৮ হাজার ২১৭টি। এর অর্ধেক পরিবার যদি নিজেদের সমর্থিত দেশের পতাকা উত্তোলন করে তা হলে দুই কোটির বেশি পতাকা তৈরি করতে হয়। বিদেশি পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের রেওয়াজ থাকায় আরও দুই কোটি জাতীয় পতাকা তৈরি করতে হয়। এতে এই স্বল্প সময়ের জন্য চার কোটিরও বেশি পতাকা তৈরি হয়ে থাকে।
প্রতিটি পতাকা তৈরিতে গড়ে ১০০ টাকা খরচ হলে মোট খরচ হয় চারশ কোটি টাকা। জার্সি ও পতাকা মিলে এই চার হাজার চারশ কোটি টাকার হিসাব অবশ্যই আনুমানিক। প্রকৃত খরচ আরও বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন পরিষদে ওয়ার্ড রয়েছে ৪১ হাজার ৩৯১টি। ৩৩০টি পৌরসভায় ওয়ার্ড রয়েছে ২ হাজার ৯৭০টি ও ১৩টি সিটি করপোরেশনে আনুমানিক ৫০০টি ওয়ার্ড ধরা হলে বাংলাদেশে মোট ওয়ার্ড হয় প্রায় ৪৫ হাজার।
প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে ৫টি পয়েন্টে বড়পর্দায় বিশ্বকাপ খেলা দেখা হলে সারা দেশে প্রায় দুই লাখ বড়পর্দা ও প্রজেক্টর প্রয়োজন হয়েছে। এ খাতে বিপুল পরিমাণ অর্র্থ খরচ হয়েছে। খেলা চলাকালে প্রতিটি পয়েন্টে চা, পান, সিগারেটের অস্থায়ী ব্যবসা হয়ে থাকে। এতেও বিপুুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের আওতায় আসে। ফলে বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে দেশে একটি বড় ধরনের বাজার তৈরি হয় যেটিকে বিশ্বকাপের অর্থনীতি বলা চলে।
স্বল্প সময়ের জন্য হলেও এ বিশ্বকাপ অনেকের জন্য একটি আয়ের উৎস হয়। অনেকের জন্য বাড়তি ব্যয়ের খাত। এই ঐচ্ছিক ব্যয়ের প্রভাব একেবারে কম নয়। জার্সি ও পতাকা বিক্রেতারা এ সময়ে যে অতিরিক্ত আয় করে তাদের পরিবারে সে আয়ের প্রভাব আছে। আমি একজন মাঝারি পর্যায়ের জার্সি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে দেখেছি। বিশ্বকাপ মৌসুমে তার অতিরিক্ত আয় লক্ষাধিক টাকা। ফলে এর অর্থনৈতিক দিকটিকে অবজ্ঞা করা যায় না। যে ইভেন্টে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা আয়-ব্যয়ের বিষয় জড়িত সে ইভেন্টের অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় আনতেই হয়।
ফুটবল আমাদের দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ফলে দেশে ফুটবলপ্রেমীর অভাব নেই। এ দেশে একসময়ে গ্রামীণ শিশুরা খড়, পুরোনো কাপড় ইত্যাদি উপাদান গোল করে শক্তভাবে রশি দিয়ে বেঁধে সেটি দিয়ে ফুটবল খেলার শখ মেটাত। জাম্বুরাজাতীয় কোনো বড় গোলাকৃতির ফল পেলে সেটিকেও ফুটবল বানাত শিশুরা। কিশোরদের মধ্যে সবাই মিলে চাঁদা তুলে ফুটবল কিনে খেলার একটি সংস্কৃতি চালু ছিল দীর্ঘদিন। ফলে এ দেশের মানুুষের রক্তে মিশে আসে ফুটবল। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো বর্তমানে এই খেলাটি বিশ্বকাপকেন্দ্রিক হয়ে গেছে।
ফুটবল ঘিরে এ দেশের মানুষের আবেগ-উচ্ছ্বাস এখন বাস্তবরূপ লাভ করে চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলে। ফুটবল এখন মাঠ থেকে পর্দায় উঠে এসেছে। এতে খেলা শুধুু দেখার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফুটবল মাঠে থাকলে তা বিনোদনের পাশাপাশি যুুবসমাজের শরীর গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ক্রীড়া একটি সুুস্থ ও নির্দোষ বিনোদন। শরীর ও মন দুটোকেই সুস্থ রাখার একটি শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো ক্রীড়া। তাই আমাদের যুুবসমাজের অবক্ষয় ও নৈতিক মূূল্যবোধ সমুুন্নত রাখার জন্য খেলার মাঠে তাদেরকে যুক্ত রাখা জরুরি। খেলার মাঠ থেকে আমাদের যুবসমাজ শিখতে পারে নিয়ম-শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, নেতৃত্ব এবং আনুগত্য। দলীয় খেলার মাধ্যমে সামাজিকতার শিক্ষা লাভ করা যায়।
সুস্থ জাতি গঠনের জন্য তাই ফুটবল তথা খেলাধুলাকে পর্দা থেকে মাঠে নামিয়ে আনতে হবে। আমাদের সন্তানরা যদি খেলার মাঠে নিয়মিত হয়ে ওঠে তা হলে শিগগিরই আমরা হয়তো ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারব। আর সেদিনই হবে ফুটবল নিয়ে আমাদের আবেগ-উচ্ছ্বাসের সফল বাস্তবায়ন। আমরা সারা জীবন অন্যদের খেলায় নিরেট দর্শক হয়ে থাকতে চাই না। আমরা চাই আমাদের সন্তানরা বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ করুক। আমরা চাই আমাদের দেশের জাতীয় পতাকা উড়ুক বিশ্বের সব দেশে। আমাদের সন্তানদের মধ্য থেকে গড়ে উঠুক মেসি, রোনালদোদের মতো ফুটবল তারকা।
এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আমাদের সামাজিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। আমরা যেমন আমাদের ক্রিকেটকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করেছি, একইভাবে ফুটবলকেও বিশ্বের দরবারে পরিচিত করতে হবে। শুধু আবেগের চর্চা নয়, বাস্তবতাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আমাদের যে সন্তানটি বিশ্বজয়ী ফুটবলার হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে জন্মেছে তাকে জোর করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার কিংবা কেরানি বানানোর অপচেষ্টা করা উচিত হবে না। সন্তানদের প্রবণতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। ভিনদেশি বিশালায়তনের পতাকার সঙ্গে যতদিন আমাদের জাতীয় পতাকা ক্ষুদ্রায়তনের হয়ে উড়বে ততদিন আমাদের ফুটবল নিয়ে এই মাতামাতি জাতীয় জীবনে কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তাই ফুটবল নিয়ে বিশ্বকাপের মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখতে হবে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা দেখে যে কেউ বাংলাদেশকে ফুটবলপাগল দেশ বলবেই। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। ফিফা র্যাংকিংয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম। এতে প্রমাণ হয় বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলপাগল হলেও ফুটবল খেলায় নৈপুণ্য দেখাতে ব্যর্থ। এর একমাত্র কারণ বাংলাদেশে মাঠের ফুটবল চর্চা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে ফুটবল ক্লাবগুলো অনেকটাই নিষ্প্রাণ ও নিষ্ক্রিয়।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) নামে যে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ফুটবল খেলায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায় সে প্রতিষ্ঠানটি আসলে ফুটবলের উন্নয়নে কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে বলে মনে হয় না। শুধুু নির্বাচনের সময় বাফুফে নামক প্রতিষ্ঠানটিকে জনসম্মুখে আসতে দেখা যায়। তারপর সারা বছর এর কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ে না। বাফুফের মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সারা দেশের বেসরকারি ক্লাবগুলোকে যদি সক্রিয় করে তোলা যায় এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ক্লাবগুলোর মালিকানা গ্রহণ করে তবে শিগগিরই ফুটবলের সুদিন ফিরে আসবে বলে মনে করা যায়।
সহকারী সম্পাদক
দৈনিক সময়ের আলো
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি