দেশের রেলব্যবস্থার সক্ষমতার তুলনায় সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক নতুন রেলপথ, সেতু, স্টেশন, সিগন্যালিং ও অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ হয়েছে। সেই সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন যে, দেশের রেল অবকাঠামো সম্প্রসারিত হলেও তার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় রেললাইনে নির্ধারিত ফি দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন। ১৩৬ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ আমলের ‘দি রেলওয়েজ অ্যাক্ট, ১৮৯০’ বাতিল করে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পুরোনো আইন বাতিল করে নতুন রেলওয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ সময়োপযোগী।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সুপারিশের আলোকে আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খসড়াটি এখন মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ট্র্যাক অ্যাকসেস চুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ইঞ্জিন ও বগি ব্যবহার করে ট্রেন চালাতে পারবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বভিত্তিক (পিপিপি) রেল পরিচালনার কাঠামো রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা তদারকির জন্য গভর্নমেন্ট ইন্সপেক্টর অব বাংলাদেশ রেলওয়ে গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি অপারেটররা সফলভাবে ট্রেন পরিচালনা করে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা এবং কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশেও এই উদ্যোগ সফল হতে পারে। কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কী শর্তে চুক্তি হবে, রেলপথ ব্যবহারের ফি কীভাবে নির্ধারিত হবে তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।
কোনো কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা যাত্রসেবায় বিঘ্ন ঘটলে তার দায় কীভাবে হবে নির্ধারণ সেই ভাবনাও থাকা দরকার। রাষ্ট্রের সম্পদের ব্যবহারে কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা যেন না থাকে সেটা নিশ্চিত করা চাই। রেল অবকাঠামো জাতীয় সম্পদ। এর ব্যবহারে অবশ্যই জনস্বার্থকে সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে।
রেল খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেন অনেকে। তাদের আশঙ্কা, এতে ধীরে ধীরে রেলব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ বাড়বে। একসময় হয়তো অলাভজনক রুট বা সাধারণ যাত্রীরা উপেক্ষিত হবে। এই উদ্বেগ পুরোপুরি অমূলক নয়। তবে প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী মালিকানা ও নীতিনির্ধারণ সরকারের হাতেই থাকবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট চুক্তির আওতায় সেবা দেবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে যদি দক্ষ চুক্তি ব্যবস্থাপনা, স্বাধীন নিরাপত্তা তদারকি এবং সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তা হলে বেসরকারি বিনিয়োগ জনস্বার্থের পরিপূরক হতে পারে। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে একই ব্যবস্থা জনস্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে বিশেষ স্বার্থ রক্ষার সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে।
ট্রেনের চলাচল ও সময়সূচিতে যেন কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। ট্র্যাক ব্যবস্থাপনা, সিগন্যালিং এবং ট্রেন পরিচালনায় কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রীসেবার মান বজায় রাখতে সময়সূচির শৃঙ্খলা রক্ষার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের রেলব্যবস্থা এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে। পুরোনো আইন বদলানো প্রয়োজন ছিল। তবে আইন পরিবর্তনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যবস্থার মান উন্নয়ন। অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সঙ্গে যদি স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং জবাবদিহি যুক্ত করা যায়, তা হলে এই উদ্যোগ রেল খাতের সক্ষমতা বাড়াবে। এটা অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি