লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন ও জোয়ারের তাণ্ডব মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও লোকালয়ের বহু বছরের ঐতিহ্য। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এবং চলমান মেগা প্রকল্পের কাজে চরম ধীরগতির কারণে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেঘনার তীর সংরক্ষণে সরকারের মেগা প্রকল্পের কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। এমনকি কাজের গুণগত মান নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, ৯৭টি প্যাকেজের অনেক ঠিকাদার কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। বিশেষ করে কমলনগরের পাটারীরহাট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েস্টার্ন কোম্পানি’র ৩০০ মিটার অংশের কাজ এখনো শুরুই হয়নি। বর্ষা মৌসুমে ঠিকাদারদের এই অনুপস্থিতি ও অবহেলার কারণে দুই উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হওয়ার চরম আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের একাংশের অভিযোগ, লক্ষ্মীপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাহিদ-উজ-জামান খানের তদারকির অভাব, সমন্বয়হীনতা ও অনিয়মের কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়নে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে রামগতির চরগাজী ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর তেগাছিয়া বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের কবরস্থান এবং স্থানীয়দের একমাত্র কাঠের সেতুটি। সরকারি বা পাউবোর পর্যাপ্ত সহায়তা না পেয়ে এই ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনা দুটি রক্ষায় নিজেদের অর্থ ও শ্রমে মাঠে নেমেছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়রা স্বপ্রণোদিত হয়ে বাঁশ, চাটাই ও বালুর বস্তা ফেলে নদীভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এ ছাড়া রঘুনাথপুর বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে নোনা পানি প্রবেশ করছে। চর আলগী ও চর বাদাম ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এবং কালভার্ট ভেঙে ইতোমধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ভুক্তভোগী মফিজ উল্লাহ আকুতি জানিয়ে বলেন, প্রতিবছরই জোয়ারের পানিতে আমাদের ডুবতে হয়। এবার জোয়ারের টান অনেক বেশি। ঘরবাড়িতে পানি উঠে গেছে, ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোথায় যাব বুঝতে পারছি না।
কমলনগর উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আবুল খায়ের জানান, পাটারীরহাট রাস্তার মাথায় ওয়েস্টার্ন কোম্পানি ৩০০ মিটার কাজ না করায় এর প্রভাবে তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি উপজেলা মাসিক সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, রামগতি ডব্লিউ-১১ ব্লকে নিম্নমানের বালু ও বড় পাথর দিয়ে কাজ করার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, এতে কোটি কোটি টাকার এ বাঁধ টেকসই না হয়ে যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। একই সঙ্গে কমলনগরের মতিরহাট, লরেন্স, ফলকন ও পাটারীরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বেশি জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাহিদ-উজ-জামান খান বলেন, মেঘনার তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। চলমান প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হলে আগামীতে লোকালয়ে আর পানি ঢোকার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।
তবে পাউবোর এসব আশ্বাসের বাণীতে আস্থা রাখতে পারছেন না উপকূলের ভিটেমাটি হারা মানুষ। রামগতি ও কমলনগরের এই মানবিক বিপর্যয় এড়াতে এবং লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় দ্রুত ও টেকসই বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ করার জোর দাবি জানিয়েছে দুর্গত এলাকার অধিবাসীরা।
সময়ের আলো/জোই