হোসেনপুরে বিলুপ্তির পথে মাকাল ফল

হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি

সারাদেশ

“গুরুমশায় বলেন তারে-বুদ্ধি যে নেই একেবারে-দ্বিতীয়ভাগ করতে সারা ছমাস ধরে নাকাল-রেগেমেগে বলেন, ‘বাঁদর, নাম দিনু তোর মাকাল।”- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এভাবেই

2026-07-23T20:03:23+00:00
2026-07-23T20:04:25+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
হোসেনপুরে বিলুপ্তির পথে মাকাল ফল
হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৮:০৩ পিএম  আপডেট: ২৩.০৭.২০২৬ ৮:০৪ পিএম
মাকাল ফল। ছবি : সংগৃহীত
“গুরুমশায় বলেন তারে-বুদ্ধি যে নেই একেবারে-দ্বিতীয়ভাগ করতে সারা ছমাস ধরে নাকাল-রেগেমেগে বলেন, ‘বাঁদর, নাম দিনু তোর মাকাল।”- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এভাবেই শিশুতোষ ‘মাকাল’ নামক কবিতায় অনুন্নত বালকটির পরিচয় তুলে ধরেছিলেন। তবে, নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই এই ফলটি অপরিচিত। একসময় কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচিত এই লতাজাতীয় উদ্ভিদটি এখন পরিবেশগত নানা কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

জানা যায়, ‘মাকাল’ নামটি মূলত উপমা থেকে এসেছে। এর আদি নাম ছিল ‘মহাকাল’, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে ‘মাকাল’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Trichosanthes tricuspidata।

মাকাল ফল পাকলে লাল রঙ ধারণ করে। ছবি : সংগৃহীত

মাকাল ফল পাকলে লাল রঙ ধারণ করে। ছবি : সংগৃহীত


মাকাল একটি বহুবর্ষজীবী লতানো উদ্ভিদ। সাধারণত বনজঙ্গল বা বড় গাছকে আশ্রয় করে এটি বেড়ে ওঠে এবং একটি পূর্ণবয়স্ক লতা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর পাতার কক্ষে সাদা রঙের ফুল ফোটে। ফলটি দেখতে অনেকটা আপেল বা ডিমের মতো। কাঁচা অবস্থায় ফল গাঢ় সবুজ, পরে হলুদ এবং সম্পূর্ণ পাকলে উজ্জ্বল লাল রঙ ধারণ করে। ফলের ভেতর কালো রঙের বীজ থাকে এবং স্বাদ তিতা। কিশোরগঞ্জের স্থানীয় ভাষায় অনেকেই একে ‘কাওয়াকাডি’ নামেও চেনেন।

একসময় হোসেনপুর অঞ্চলের কৃষকেরা মাকাল ফলের বীজ ও আঁশ থেকে তৈরি প্রাকৃতিক বিষ ফসলের পোকামাকড়, ইঁদুর ও বিভিন্ন রোগ দমনে ব্যবহার করতেন। এই বিষ ফসলের জন্য ক্ষতিকর ছিল না এবং পরিবেশবান্ধব হিসেবেই পরিচিত ছিল। বর্তমানে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে এই প্রাকৃতিক বিষের চাহিদা প্রায় হারিয়ে গেছে।

স্থানীয় পরিবেশবিদ অধ্যাপক এবিএম ছিদ্দিক চঞ্চল বলেন, ‘নানা কারণে প্রাকৃতিক বন উজাড় হওয়ায় মাকাল ফল হারিয়ে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি নানা ধরনের কীটনাশকের প্রভাবে পরিবেশবান্ধব মাকালের বিষ আর কেউ কিনতে চায় না। বাজারেও পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি জরুরি।’


স্থানীয় বৃক্ষপ্রেমী মো. নবী হোসেনসহ অনেকেই জানান, মাকাল ফল ও গাছের বেশ কিছু ভেষজ গুণও আছে। মাকাল গাছের শিকড় কোষ্ঠকাঠিন্য ও বদহজমের ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে। কফ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময়, নাক ও কানের ক্ষত উপশমে, জন্ডিস নিরাময়ে, দেহে কোনো কারণে পানি জমলে অর্থাৎ শ্লথ রোগে দেহ থেকে পানি দূর করতে, স্তনের প্রদাহ, প্রস্রাবের সমস্যা, বাত ব্যথা, কাশি, পেট বড় হয়ে যাওয়া এবং শিশুদের অ্যাজমা নিরাময়ে মাকাল গাছের ফল-মূল-কাণ্ড বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

মাকালের বীজের তেল সাপ ও বিছার কামড়, আমাশয়, ডায়রিয়া, মৃগীরোগসহ বিভিন্ন সমস্যায় ব্যবহারের কথা প্রচলিত রয়েছে। এছাড়া, এই তেল সাবান তৈরিতেও ব্যবহার করা যায় এবং চুলের বৃদ্ধি ও চুল কালো রাখতেও কার্যকর বলে ধারণা করা হয়।

একসময় বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় একসময় এ গাছের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে, গত এক যুগে এর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আগে যেখানে ব্যাপকভাবে দেখা যেত, বর্তমানে তা প্রায় দশ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দশকে বাংলাদেশ থেকে মাকাল ফল সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   হোসেনপুর  বিলুপ্তি  মাকাল  ফল  কিশোরগঞ্জ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: