সমাজ-সংস্কৃতির বৈশ্বিক জগতে লেগেছে ডিজিটালাইজেশনের ঢেউ। সোশ্যাল মিডিয়া এখন বেশ জনপ্রিয় কারবার। আবালবৃদ্ধবনিতা সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এ যেন প্রযুক্তির আফিম। নীরবে-সরবে সবাই এই জগতে ঘুরপাক খায়। সামাজিক যোগাযোগের ডিজিটাল মাধ্যমে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে ফেসবুক। কে এবং কী নেই এখানে? পুরোহিত থেকে ইমাম ফেসবুকে যুক্ত। খানসামা থেকে রেলসেবা সবকিছুর সরব উপস্থিতি এখানে। কেনই বা হবে না? বিশ্ব যে আজ হাতের নাগালে। শেয়ার লাইক কমেন্টসের সুবাদে রাতারাতি হিরোকে জিরো এবং জিরোকে হিরো বানিয়ে ফেলে এই মাধ্যম।
ফেসবুকের আগ্রাসী বিস্তারে মূলধারার যোগাযোগমাধ্যমগুলো অনেকটাই আজ নিবু নিবু প্রায়। এই জগতে বিচরণে কোনো যোগ্যতা লাগে না। পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডের বালাই নেই। রীতিনীতির তোয়াক্কাও করতে হয় না। ফেইক আইডি, চটকদার ছবি, নানা পদের ভিডিও এসবে তাৎক্ষণিক উত্তেজনাও তৈরি করে। নানা কারণে ইদানীং সবাই ফেসবুকে হুমড়ি খায়। সংবাদের সহজলভ্যতা এবং লাগামহীন স্বাধীনতাই কি এর পেছনের শক্তি জোগায়? সবাই ফেসবুক ব্যবহার করতে চায়।
এসবে মাঝে মাঝে কাউকে না কাউকে বিপাকেও পড়তে হয়। পরিবেশ-পরিস্থিতি এই প্ল্যাটফর্মে বেশ জরুরি। এ যেন পুলসিরাত! যেখানে প্রকাশ পায় ব্যবহারকারীর মনন, পারিবারিক ঐতিহ্য, ব্যক্তিত্ব এবং মানসিকতা। এ এমন জগৎ যেখানটায় জ্বলে ওঠে মনন, রুচি এবং দীনতার গভীরতা। নেশায় বুঁদ হয়ে অনেকেই খেই হারিয়ে ফেলে। মেজাজ ঠিক রাখতে না পেরে দিগি^দিক ছুটে। এ কেমন প্ল্যাটফর্ম? অতএব সাধু সাবধান! ধীরে চলুন, নতুবা রেগে যাবেন তো হেরে যাবেন। শাবাশ জুকারবার্গ!
ফেসবুক সাধারণত নানা কিসিমের সত্য অর্ধসত্য ফেক মিথ্যা খবরের সমারোহ। এ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এসবে এমনভাবে মত্ত থাকে, কখন যে বিহান গড়িয়ে বিকেল, এমন কি রাত হয়ে যায় তা ঠাহর করতে ও পারে না। এ জগতের নতুন বাতিক হলো, যারা কোনো নতুন পদে আসীন হয়, তাকে ঘিরে তোষামোদি এবং পেইড সেøভ-বাহিনী প্রপাগান্ডা এবং তৎপরতা! এখানটায় খুব কাছের প্রমাণ করতে গিয়ে নানা উটকো অস্থিরতাও তৈরি করে বসে। যারা এসবে সরব তাদের অনেকেই নিজের অতীতকে ধামাচাপা দিতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে স্ক্রিনশট পার্টির কবলে পড়ে যায়।
যেমনটা বলা যায়, প্রভাবশালী এক কর্মচারী যিনি কি না বিপ্লব-পূর্ববর্তী আগস্ট বন্দনায় বেশ পারঙ্গম ছিলেন। অথচ সময়ের হাওয়ায় তিনি এখন হাদির দরগা থেকে খালেদা জিয়ার কবরের স্থিরচিত্র ফলাও করে ফেসবুকে পোস্ট দেন। ওনার গিরগিটিপনার বাতিক রহস্যে মোড়ানো। যদিও এখন নানা কারণে ওনারা কোণঠাসা। তারপরও রিসেট বাটনে চাপ দেওয়ার ফিকির! কিন্তু বিধিবাম! সেই স্ক্রিনশটের আমলনামা ফেসবুকের কল্যাণে অনেকের ড্রাইভ এবং আর্কাইভসে ফিতাবন্দি! যা রুচির দীনতা এবং প্রকাশভঙ্গির দ্বিচারিতাকেই ইঙ্গিত করে। চাইলেই কি এসব মুছে ফেলা যাবে? তাই ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।
ফেসবুকে যেকোনো বিষয়ে শেয়ার দেওয়া, নিজের ওয়ালে কিছু লিখা, ভিডিও আপলোড করা, মেমোরি শেয়ার, লাইক কমেন্টস এবং ইমোজির বিষয়ে যদি যত্নবান না হওয়া যায় তা হলে পাছে রসাতলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কেননা এসবেই প্রকাশ পায় আপনার অতীত, মর্যাদা, আচরণ, সামাজিকতা, অহমিকা, ধৈর্য, জবাবদিহিতা বড়ত্ব এবং চারপাশ। বন্ধু কে হবে? এসব আপনার পরিচয়কে ইঙ্গিত করে।
ফেসবুক ব্যবহারকারীদের যদি ধৈর্য এবং পরিস্থিতির মেনে নেওয়ার সক্ষমতা না থাকে, তা হলে এ মাধ্যমে আপনার না। এতে করে আপনি নানাবিধ মানসিক-শারীরিক ঝামেলায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতএব কমেন্টস লাইক শেয়ারে অন্তত শতবার ভাবুন। বন্ধু নির্বাচনে যদি ভুল করেন এবং তার দ্বারা যদি আপনার ওয়ালে অশ্লীল তথ্যসংবলিত কমেন্টস শোভা পায়, তা আখেরে আপনার অর্জন দাপট আন্তর্জাতিক কালেকশন গবেষণায় পাণ্ডিত্য বুমেরাং করে ফেলবে। তখনই প্রশ্ন আসবে যেমন মনন তেমন প্রকাশ। যেমনটা মহাত্মা গান্ধীর কথায়ও এসেছে- একটি জাতির সংস্কৃতি তার ভাষা ও আচরণে প্রতিফলিত হয় এবং এরিস্টটলের অনুধাবন হলো শিক্ষার চূড়ান্ত ফল জ্ঞান নয়, উত্তম চরিত্র। তাই সাবধানে এ বাহনে চড়া লাগবে।
কে আপনি? সমাজ-জাতিই স্বীকৃতি দেবে। ফেসবুকে নিজের গুণগান বা ব্যক্তিগত অর্জন, অন্যের যোগ্যতা নিয়ে জমিদারিপনা, ছবি, ভ্রমণ, ঘোরাঘুরি, ক্ষমতা, চর্চা কতটা বালখিল্যে যা সময়েই টের পাওয়া যায়। পেশার মর্যাদা দেওয়া লাগবে। ইদানীং দেখা যায় পেশাকেন্দ্রিক নানা অস্থির পোস্ট। ঘায়েল করার মাঝেই যেন বাহাদুরি। আমাদের যাত্রাপথ কোনদিকে ভেবেছি কি? বিশেষত ইদানীং বিদেশমুখিতা এবং সামাজিকতার স্খলনের সুযোগে দিশা হারিয়ে কেউ কেউ আবোলতাবোল বয়ান তৈরি করার চেষ্টা করছে। এসবে প্রবীণের কুটুরী প্রথা, গোপন ভালোবাসা এবং পীর মুরিদি সোহবত অনেকটা জ্বালানি হিসেবে ঘি সরবরাহ করে। এ প্রসঙ্গে গল্প মনে এলো। গ্রামের এক ছেলে বিদেশে গিয়ে একখানা ডিগ্রি জোগাড় করল। নামের পাশে ঝলমলে অক্ষর, চোখে নতুন দুনিয়া ঘোরেফিরে এলো গ্রামে, যেন পায়ের নিচে মাটি নয়, মেঘ বিছানো।
একদিন হাটে গিয়ে সে ঘোষণা দিল, আমি এখন গ্লোবাল মানুষ! তখন এক বৃদ্ধ বলল, বাবা, ডিগ্রি যদি মানুষকে বড় করে, তবে সম্মান কোথায় শিখলে? ছেলেটি হেসে বলল, এগুলো পুরোনো কথা। বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন, পুরোনো সূর্যই তো আলো দেয়, নতুন অহংকার শুধু ছায়া ফেলে। কী বুঝলেন মশাই! এসবের মাঝেই রুচির দুর্ভিক্ষের ইঙ্গিত প্রবাহিত হয়।
তোষামোদি সবার অভিধানে নেই। ‘আমরা আপনার লোক’ সবাই হতে পারে না। সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের ব্যক্তিত্ব বোধবিচার রয়েছে যারা পাওয়ার জন্য তদবির করে না, তেলবাজিতে যিনি পা বাড়ান না, যাদের অন্তরে গিরগিটিপনা নেই। তারা অনেক সময় অপ্রিয় সত্য, সমাজে বিচ্যুতি, অসংগতি এবং অস্থিরতা চোখে আঙুল দিয়ে পত্রপত্রিকায় পাবলিক করেন।
এসব ঘটনা যাদের চরিত্রে কিঞ্চিত মিলে যায়, তারা ভাবে সে বুঝি আমাকেই ইঙ্গিত করল। অনেকটা এমন চোরের মনে পুলিশ পুলিশ! এসব প্রতিবাদীরা মাঝেমধ্যে পেইডসেøভের সাইবার আক্রমণের শিকার হয়। অথচ ভাড়াটেরা জানে না, ওই মানুষগুলো কত শক্তিমান। যথার্থই এ ক্ষেত্রে রলফ ওয়াল্ডো এমারসনের বক্তব্য অনুমেয়- দৃঢ়চেতা মানুষ বাহ্যিক বঞ্চনায় ভেঙে পড়ে না, কারণ তাদের শান্তি ভেতর থেকে আসে। সংগতভাবেই এ প্রসঙ্গে জর্জ অরওয়েলের মতামত এখানটায় বেশ প্রাসঙ্গিক ভণ্ডামির সমাজে সত্য বলা বিপ্লবের মতো- তাই সত্যবাদীরা সুবিধা হারায়। এ বিষয়ে নেলসন ম্যান্ডেলার বক্তব্য ও বেশ জুথসই দৃঢ়চেতা মানুষ প্রথমে বাধার মুখে পড়ে, পরে ইতিহাস তাদেরই স্বীকৃতি দেয়। এসব প্রেরণা জোগায়। এভাবেই মনন প্রস্ফুটিত হয়। নীরবে আমজনতার ভালোবাসায় এসব মানুষ সিক্ত হয়। জাগতিক অপ্রাপ্তি এদের বিচলিত করতে পারে না।
ফেসবুক এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। চাইলে কি এত সহজে এর বাইরে থাকা যায়? বরং এই প্ল্যাটফর্মকে নতুনভাবে বোঝা ও ব্যবহারের সময় এসেছে। মাঝেমধ্যে কিছু জ্ঞানপাপীর স্ট্যাটাস দেখে মনে হয়, ফেসবুক আসলে কার? এখানে অনেক সময় সত্যের চেয়ে প্রদর্শনই বেশি গুরুত্ব পায়। ইবনে খালদুন তার সমাজবিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, ক্ষমতার আশপাশে চাটুকারিতা বাড়তে থাকে, আর সত্যের কণ্ঠ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে যারা সত্য কথা বলতে অভ্যস্ত, তাদের অনেক সময় হেয় করে আনন্দ নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ইমাম গাজ্জালিও একই বাস্তবতার কথা বলেছেন। তার মতে, সত্য কথা সবসময় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না; কারণ মানুষ নিজের অভ্যাস, স্বার্থ ও অহংকারের গণ্ডি সহজে অতিক্রম করতে চায় না।
সময় এখনই এসবে কৌশলী এবং সাবধান হওয়ার। আপনার মনন কালচার রুচির সাক্ষী হলো ফেসবুক। আপনার ফেসবুক ওয়ালে ডিলিট বাটনে চাপ দিলেই এসব মুছে ফেলা যায় না। বেশি চালাক ভাবার সুযোগ সেই! আসুন ফেসবুক ব্যবহারে আরও বেশি যত্নশীল হই। আপনার ধৈর্যশীল মনোভাব সম্মান শ্রদ্ধাবোধ ভালোবাসা প্রেম জাতীয়তাবোধ এবং আন্তরিকতার চর্চার মাঝেই জানান দেওয়া যাবে আমাদের মনন আমাদের প্রকাশ। দেখা মিলবে সুন্দর সত্য সাম্যের আগামী।
অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব