মাদক নির্মূলে সামাজিক প্রতিরোধই মোক্ষম হাতিয়ার

আকমল হোসেন

মতামত

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ব্রিটিশরা চীনে আফিম পাচারের চেষ্টা চালায়। চীনা কর্মকর্তা লিন জেশুর দৃঢ় পদক্ষেপে সেই প্রচেষ্টা প্রতিহত হয়।

2026-07-23T14:58:14+00:00
2026-07-23T14:58:14+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
মতামত
মাদক নির্মূলে সামাজিক প্রতিরোধই মোক্ষম হাতিয়ার
আকমল হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ২:৫৮ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ব্রিটিশরা চীনে আফিম পাচারের চেষ্টা চালায়। চীনা কর্মকর্তা লিন জেশুর দৃঢ় পদক্ষেপে সেই প্রচেষ্টা প্রতিহত হয়। মাদকবিরোধী আন্তর্জাতিক আন্দোলনের ইতিহাসে তার ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকেই মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৯৯০ সালের আইনের পর ২০১৮ ও ২০২০ সালে সংশোধনী আনা হয়। সবশেষ সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০২৬ নামে একটি বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছে। তবে আইন যতই কঠোর হোক, তার কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সিঙ্গাপুর তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

একটি বহুল প্রচলিত কথা হলো- সমস্যা সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারলেই সমাধানের পথ সহজ হয়। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ স্বাধীনতার পর দেশের অন্যতম প্রধান সামাজিক সমস্যা হিসেবে মাদকাসক্তিকে চিহ্নিত করেছিলেন। 

তার নেতৃত্বে কঠোর আইন প্রয়োগ, কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়। এর ফলে সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও বাসযোগ্য দেশে পরিণত হয়েছে। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চ গড় আয়ুও সেই সাফল্যের অংশ।

সাম্প্রতিক নয়, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হচ্ছে যে, মাদক কেনার টাকা না পেয়ে অনেক সন্তান মা-বাবার ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে, এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটছে। আবার অনেক মা-বাবা নিজেদের অসহায়ত্বের কারণে মাদকাসক্ত সন্তানকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিচ্ছেন। 

দুটি ঘটনাই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, সন্তানের চেয়ে প্রিয় আর কিছুই একজন মা-বাবার কাছে হতে পারে না। তবু সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষার আশায় তারা এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি সমাজে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারেরই নির্মম প্রতিচ্ছবি।

তামাক, বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দা কিংবা অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্যের মাধ্যমেই অনেকের নেশাজীবনের শুরু। পরে তা ফেনসিডিল, প্যাথিডিন, মদ, হেরোইন এবং সবশেষ ইয়াবার মতো ভয়াবহ মাদকে গিয়ে পৌঁছায়। মাদকবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস রয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর রয়েছে, শিক্ষাক্রমে মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগ রয়েছে। এমনকি বিড়ি, সিগারেট ও জর্দার মোড়কেও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা মুদ্রিত থাকে। তবু মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে সম্ভব হচ্ছে না। এর কারণ ও সীমাবদ্ধতার ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই ভালোভাবে দিতে পারবেন।

মাদক ব্যবহার ও ব্যবসার বিরুদ্ধে দেশে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব ব্যবস্থা যেন কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। মনে হয়, কোনো ব্যবস্থাই প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। একসময় মাদক ব্যবসা দমনে ‘ক্রসফায়ার’-এর মতো বিচারবহির্ভূত পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। 

কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, কেবল কঠোর অভিযান সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। এ নিয়ে মানবাধিকারকর্মী, সচেতন নাগরিক, রাজনৈতিক দল, এমনকি সরকারের ভেতর থেকেও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব বাস্তবতা প্রমাণ করে, মাদকের মতো জটিল সামাজিক সমস্যার সমাধান কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়।

মাদক ব্যবসার সঙ্গে সমাজের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মানুষ, রাজনীতিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও এমন অভিযোগের প্রতিফলন দেখা গেছে। 

আবার মাঠ পর্যায়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, কিছু রাজনৈতিক কর্মী, বস্তিবাসী এবং পথশিশুদের ব্যবহার করে মাদক বিপণনের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। ফলে মাদকবিরোধী অভিযান অনেক সময় কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন করতে পারে না।

প্রায়ই দেখা যায়, প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইনের পূর্ণ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন না। অনেক ক্ষেত্রে গ্রেফতারের পরও প্রভাব খাটিয়ে তারা ছাড়া পেয়ে যান। আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং আইনের অসম প্রয়োগই মাদক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এ বাস্তবতায় অতীতে বিচারবহির্ভূত পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হলেও তা কোনো টেকসই সমাধান দিতে পারেনি।

একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার ছাড়া কাউকে হত্যা, তিনি যত বড় অপরাধীই হোন না কেন, সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। বিশ্বের বহু দেশ মৃত্যুদণ্ডের বিধানও বাতিল করেছে। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিচার ছাড়া রাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। একটি সভ্য রাষ্ট্রে অপরাধ দমনের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস মানুষের জ্ঞান ও বিবেকের গুরুত্বের কথা বলেছেন। মানুষকে ধ্বংস নয়, সংশোধনের সুযোগ দেওয়াই একটি মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই আইন, বিচার ও সুশাসনের পাশাপাশি মানুষের আত্মউপলব্ধি, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সমিতি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, উন্নয়নকর্মী, সমবায়কর্মী এবং সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।

মাদক নির্মূলে সামাজিক প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসনের নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মাদকসেবী বা মাদক ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। সরকার, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল, যদি সত্যিকার অর্থে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গড়তে চায়, তবে আইনের প্রয়োগে কোনো ধরনের বৈষম্য চলতে পারে না।

বাংলা প্রবাদে আছে, ‘ফসল রক্ষার বেড়াই যদি ফসল খায়, তবে সেই ফসল রক্ষা করা যায় না।’ তেমনি যাদের ওপর মাদক দমনের দায়িত্ব, তারাই যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ কাজে জড়িয়ে পড়েন কিংবা সহায়তা করেন, তা হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। 

গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার কারণে কেউ যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে না পারে সেই নিশ্চয়তাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

যুবসমাজই একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সভ্যতার প্রধান নির্মাতা। ইতিহাস বারবার সেই সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছে। অথচ এই যুবসমাজকে যদি পরিকল্পিতভাবে মাদকের মাধ্যমে চেতনাহীন ও কর্মক্ষমতাহীন করে দেওয়া হয়, তা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি। বাংলাদেশের ইতিহাসে নব্বই সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান- সব ক্ষেত্রেই তরুণদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। সেই শক্তিকে ধ্বংস হতে দেওয়া কোনোভাবেই জাতির স্বার্থে নয়।

তরুণদের মনে রাখতে হবে, মাদকের নেশায় জীবন নষ্ট করা কখনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের কাছে অনেক প্রত্যাশা করে। তাদের শিক্ষার পেছনে পরিবার ও রাষ্ট্রের বিনিয়োগ রয়েছে। সেই ঋণ পরিশোধের সর্বোত্তম উপায় হলো নিজেকে সুস্থ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। 

মাদকাসক্তির মৃত্যু আর সম্মানজনক জীবনের অবসান এক নয়। তাই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র- সবাইকে একযোগে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে, মাদক থেকে দূরে থাকার এবং অন্যকেও দূরে রাখার। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে এ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   মাদক নির্মূল  সামাজিক প্রতিরোধ  হাতিয়ার 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: