ঢাকার মেট্রোরেল কি মরণফাঁদ?

সাইফুল ইসলাম

মতামত

রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন, সময় সাশ্রয় এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নির্মিত এমআরটি লাইন-৬ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো

2026-07-22T20:22:40+00:00
2026-07-22T20:22:40+00:00
 
  বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬,
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
মতামত
ঢাকার মেট্রোরেল কি মরণফাঁদ?
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৮:২২ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন, সময় সাশ্রয় এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নির্মিত এমআরটি লাইন-৬ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প। চালুর পর থেকেই এটি রাজধানীর লাখো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিদিন এই সেবার ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ এবং স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এসব প্রতিবেদনে এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছে, যা শুধু সাধারণ যাত্রীদের মধ্যেই উদ্বেগ সৃষ্টি করেনি, বরং দেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর নির্মাণমান, তদারকি এবং পরিচালনা ব্যবস্থার ওপরও নতুন করে আলোকপাত করেছে।

মেট্রোরেল নিয়ে উদ্বেগের সূচনা হয় ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। ওই দিন মেট্রোরেলের একটি পিলার থেকে একটি বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে পথচারী আবুল কালামের মৃত্যু হয় এবং আরও দুজন আহত হন। ঘটনার পর সেতু বিভাগ একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং পরে আদালতের নির্দেশনায় একটি স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট পরিচালিত হয়। তদন্তে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরীক্ষাগারে বেয়ারিং প্যাড পরীক্ষা করে দেখা যায়, দুর্ঘটনাস্থলের দুটি বেয়ারিং প্যাড নির্ধারিত মান পূরণ করতে পারেনি। একই সঙ্গে তদন্তে ভায়াডাক্টের কিছু নকশাগত সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে আসে। তদন্ত কমিটি নাশকতার কোনো প্রমাণ পায়নি; বরং নির্মাণমান, কারিগরি ত্রুটি এবং মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকেই ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

এরপর ২০২৬ সালে প্রকাশিত স্বাধীন নিরাপত্তা অডিটে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে। অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পরিদর্শন করা বেয়ারিং প্যাডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ত্রুটিপূর্ণ। বিভিন্ন স্থানে বেয়ারিং প্যাডের অস্বাভাবিক ক্ষয়, স্থানচ্যুতি এবং কার্যকারিতা হ্রাসের প্রমাণ পাওয়া যায়। কয়েকটি পিয়ারে ট্রেন চলাচলের সময় অস্বাভাবিক ধাক্কা ও কম্পন অনুভূত হয়েছে এবং একটি স্থানে বেয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুত হওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়া কিছু পিয়ারে সূক্ষ্ম ফাটল, ট্র্যাকের অস্বাভাবিক আচরণ এবং ওভারহেড বৈদ্যুতিক লাইনে প্রযুক্তিগত সমস্যার বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ত্রুটি অবিলম্বে মেরামত করা না হলে দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেছেন, বেয়ারিং প্যাড কোনো উড়াল রেলপথের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি ট্রেনের ওজন বহন করে, কম্পন নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভায়াডাক্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়া থেকে কাঠামোকে রক্ষা করে। ফলে এই উপাদানের সামান্য ত্রুটিও সময়ের সঙ্গে বড় ধরনের প্রকৌশলগত সমস্যার জন্ম দিতে পারে। যদিও তদন্ত কমিটি কোথাও মেট্রোরেল অবিলম্বে বন্ধ করার সুপারিশ করেনি, তবে তারা দ্রুত ত্রুটিগুলো মেরামত, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, তা হলো প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাপনার প্রবণতা। অর্থাৎ কোনো ত্রুটি প্রকাশ্যে আসার পর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নিয়মিত কাঠামোগত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং পূর্বাভাসভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। আধুনিক রেলব্যবস্থায় যেখানে নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিরাপত্তার মূল ভিত্তি, সেখানে এমন ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

কাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি পরিচালন ব্যবস্থাপনাতেও বিভিন্ন সময়ে দুর্বলতা দেখা গেছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া, ওভারহেড লাইনে ঘুড়ি বা অন্যান্য বস্তু আটকে অপারেশন ব্যাহত হওয়া, স্বয়ংক্রিয় দরজার ত্রুটি, টিকিটিং ব্যবস্থার জটিলতা এবং অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামাল দিতে সীমাবদ্ধতার মতো ঘটনা দেখিয়েছে যে উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল, কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।

তবে এই সমালোচনার মধ্যেও মেট্রোরেলের ইতিবাচক অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। চালুর পর রাজধানীর যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যাতায়াতের সময় অনেক কমেছে এবং নগর অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ নিরাপদে এই সেবা ব্যবহার করছেন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মেট্রোরেল ব্যবস্থাতেও সময়ে সময়ে কারিগরি ত্রুটি দেখা যায়। পার্থক্য হলো, সেখানে দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানের রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে জনআস্থা অক্ষুণ্ন রাখা হয়।

তাই প্রশ্নটি আসলে মেট্রোরেল ‘মরণফাঁদ’ কি না, সেটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চিহ্নিত ত্রুটিগুলো কত দ্রুত এবং কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে সমাধান করা হচ্ছে। যদি এসব ত্রুটি অবহেলিত হয়, তবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। আবার যদি স্বাধীন নিরাপত্তা অডিটের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়, নিয়মিত স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং চালু থাকে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত হয় এবং সব ধরনের নিরাপত্তা মূল্যায়ন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়, তাহলে মেট্রোরেল আরও নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত হবে।

সবশেষে বলা যায়, মেট্রোরেল বাংলাদেশের আধুনিক উন্নয়নের প্রতীক এবং জাতীয় গর্বের একটি অবকাঠামো। কিন্তু এই গর্ব তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর প্রতিটি যাত্রা হবে শতভাগ নিরাপদ এবং প্রতিটি সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ থাকবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য নয়; বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে সময়মতো সংস্কারের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি আধুনিক নগরের পরিচয় শুধু উন্নত অবকাঠামো নয়, সেই অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত।

লেখক : কলামিস্ট

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   মেট্রোরেল 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: