ফেসবুক থেকে চাইলেই কি দূরে থাকা যাবে?

ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস

মতামত

ডিজিটালাইজেশনের যুগে ফেসবুক আমাদের জীবনের অন্যতম প্রভাবশালী মাধ্যম। আবালবৃদ্ধবনিতা সবার নেশা এবং আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু প্রযুক্তির এই আফিম। নীরবে-সরবে সবাই এখানটায়

2026-07-23T19:33:02+00:00
2026-07-24T01:09:57+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
ফেসবুক থেকে চাইলেই কি দূরে থাকা যাবে?
ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৩৩ পিএম  আপডেট: ২৪.০৭.২০২৬ ১:০৯ এএম
মনন, সংস্কৃতি ও রুচির সাক্ষী হলো ফেসবুক। গ্রাফিক : সময়ের আলো
ডিজিটালাইজেশনের যুগে ফেসবুক আমাদের জীবনের অন্যতম প্রভাবশালী মাধ্যম। আবালবৃদ্ধবনিতা সবার নেশা এবং আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু প্রযুক্তির এই আফিম। নীরবে-সরবে সবাই এখানটায় ঘুরপাক খায়। কে এবং কি নেই এখানে? পুরোহিত থেকে ইমাম, খানসামা থেকে রেলসেবা সবকিছুরই সরব উপস্থিতি! কেনইবা হবে না? বিশ্ব যে আজ হাতের নাগালে। শেয়ার, লাইক, কমেন্টসের সুবাদে রাতারাতি হিরোকে জিরো এবং জিরোকে হিরো বানিয়ে ফেলে এ মাধ্যম। ফেসবুকের আগ্রাসী বিস্তারে মূলধারার মাধ্যমগুলো অনেকটাই আজ নিভু নিভু এবং কোণঠাসাও বটে। এ জগতে বিচরণে কোনো যোগ্যতা লাগে না, কোনো ব্যাকগ্রাউন্ডের বালাই নেই, পারিবারিক তোয়াক্কাও করতে হয় না। এখানে মুহূর্তেই মানুষ পরিচিতি পায়, আবার অসচেতনতার কারণে সমালোচনার মুখেও পড়ে। এখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজন। একজন মানুষের রুচি, চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিত্ব অনেকটাই তার ফেসবুক ব্যবহারে প্রকাশ পায়। তাই আবেগ নয়, সংযম ও সচেতনতার সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। 

২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মার্ক জুকারবার্গের হাত ধরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্য ফেসবুকের যাত্রা। ২০২১ সাল থেকে ফেসবুক মেটা প্ল্যাটফর্মের অধীন, যেখানটায় হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার এবং ইনস্টাগ্রামও রয়েছে। সবকিছু ছাপিয়ে আলাদাভাবে ফেসবুক মানুষের মননে জায়গা করে নিয়েছে। এখানটায় সব শ্রেণিপেশার মানুষ রয়েছে। এসব যখন জেনজি আলফা বিটার মুঠোয় আসছে, তখন দেখা যায় গণেশ কীভাবে উল্টায়? প্রজন্মের এখন সামাজিকীকরণের বৈকল্য চলছে, ভার্চুয়াল চলাফেরাতেই তাদের স্বাচ্ছন্দ্য।


ফেসবুক সাধারণত নানা কিসিমের সত্য, অর্ধসত্য, মিথ্যা খবরের সমারোহ। এ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এসবে এমনভাবে মত্ত থাকে, কখন যে সকাল গড়িয়ে বিকেল, এমনকি রাত হয়ে যায়, তা বুঝতেও পারে না। এ জগতের অন্যতম বাতিক হলো, যারা কোনো নতুন পদে আসীন হয়, তাকে ঘিরে তোষামুদি এবং পেইড স্লেভবাহিনীর প্রপাগান্ডা এবং তৎপরতা! এখানটায় খুব কাছের প্রমাণ করতে গিয়ে নানা উটকো অস্থিরতাও তৈরি করে বসে। যারা এসবে সরব, তাদের অনেকেই নিজের অতীতকে ধামাচাপা দিতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে স্ক্রিনশট পার্টির কবলে পড়ে যায়। 

ফেসবুকে যেকোনও বিষয় শেয়ার দেওয়া, নিজের ওয়ালে কিছু লেখা, ভিডিও আপলোড করা, মেমোরি শেয়ার, লাইক কমেন্টস এবং ইমোজির বিষয়ে যদি যত্নবান না হওয়া যায়, তাহলে রসাতলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কেননা এসবেই প্রকাশ পায় আপনার অতীত, মর্যাদা, আচরণ, সামাজিকতা, অহমিকা, ধৈর্য এবং চারপাশ।

বন্ধু কে হবে? এসব আপনার পরিচয়কে ইঙ্গিত করে। এখানটায় একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। শিক্ষা বিভাগের এক কর্মচারীর ওয়ালে চাউর হলো একখানা স্ট্যাটাস। দেখে মনে হচ্ছে পারিবারিক অশান্তি, ট্যাগিং পলিটিক্স এবং লেভেলিং তকমায় মাথা গরম করে এমন ভাষার প্রয়োগ, যা কিনা পেশার শানশওকতের সঙ্গে নিদারুণ বেমানান! ওই পোস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগসংক্রান্ত এক ব্যক্তির পজিশন এবং রেজাল্ট উপস্থাপনে আত্মস্বীকৃত মিথ্যাবাদীর পরিচয় দিয়েছেন। যার অনার্সে প্রথম এবং নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশেও প্রথম হওয়ার প্রমাণাদি সংশ্লিষ্ট দফতরে সংরক্ষিত, তথাপিও প্রথমকে বাদ দিয়ে চতুর্থকে নেওয়ার যে গাঁজাখুরি আবদারের ফিরিস্তি দিয়েছেন, এসব জনতার আদালতে সরাসরি কট এন্ড বোল্ড হয়েছে। 


ফেসবুক ব্যবহারকারীদের যদি ধৈর্য এবং পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার সক্ষমতা না থাকে, তাহলে এ মাধ্যম আপনার না। এতে আপনি নানাবিধ মানসিক ও শারীরিক ঝামেলায় পড়তে পারেন। অতএব, কমেন্টস, লাইক, শেয়ারে শতবার ভাবুন। বন্ধু নির্বাচনে যদি ভুল করেন এবং তার দ্বারা যদি আপনার ওয়ালে অশ্লীল তথ্যসম্বলিত কমেন্টস শোভা পায়, তা আখেরে আপনার অর্জন, দাপট, আন্তর্জাতিক গবেষণায় পাণ্ডিত্য বুমেরাং করে ফেলবে। 

কে আপনি? সমাজ ও জাতিই স্বীকৃতি দেবে। ফেসবুকে নিজের গুণগান বা ব্যক্তিগত অর্জন, অন্যের যোগ্যতা নিয়ে  জমিদারীপনা, ছবি, ভ্রমণ, ঘোরাঘুরি, ক্ষমতা, চর্চা কতটা বালখিল্য, তা সময়েই টের পাওয়া যায়। পেশার মর্যাদা দিতে হবে। ইদানীং দেখা যায়, পেশাকেন্দ্রীক নানা অস্থির পোস্ট। ঘায়েল করার মাঝেই যেন বাহাদুরি। আমাদের যাত্রাপথ কোনদিকে, ভেবেছি কি? বিশেষত ইদানীং সামাজিকতার স্খলনের সুযোগে দিশা হারিয়ে কেউ কেউ আবোলতাবোল বয়ান তৈরি করার চেষ্টা করছে। 

এ প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে আসল। গ্রামের এক ছেলে বিদেশে গিয়ে একখানা ডিগ্রি জোগাড় করল। নামের পাশে ঝলমলে অক্ষর, চোখে নতুন দুনিয়ার ঘোর- ফিরে এলো গ্রামে, যেন পায়ের নিচে মাটি নয়, মেঘ বিছানো। একদিন হাটে গিয়ে সে ঘোষণা দিল, আমি এখন গ্লোবাল মানুষ! তখন এক বৃদ্ধ বলল, বাবা, ডিগ্রি যদি মানুষকে বড় করে, তবে সম্মান কোথায় শিখলে? ছেলেটি হেসে বলল, এগুলো পুরনো কথা। বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন, পুরনো সূর্যই তো আলো দেয়, নতুন অহংকার শুধু ছায়া ফেলে। কি বুঝলেন মশাই! 


তোষামোদি সবার অভিধানে নেই। ‘আমরা আপনার লোক’ সবাই হতে পারে না। সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের ব্যক্তিত্ব বোধবিচার রয়েছে, যারা পাওয়ার জন্য তদবির করে না, তেলবাজিতে পা বাড়ায় না, যাদের অন্তরে গিরগিটিপনা নেই। তারা অনেক সময় অপ্রিয় সত্য, সমাজের বিচ্যুতি, অসংগতি এবং অস্থিরতা চোখে আঙুল দিয়ে প্রকাশ করেন। এসব ঘটনাগুলো যাদের চরিত্রে কিঞ্চিৎ মিলে যায়, তারা ভাবে সে বুঝি আমাকেই ইঙ্গিত করল! অনেকটা এমন, চোরের মন পুলিশ পুলিশ! এসব প্রতিবাদীরা মাঝেমধ্যে পেইডস্লেভের সাইবার আক্রমণের শিকার হয়। অথচ ভাড়াটেরা জানে না, ওই মানুষগুলো কত শক্তিমান! যথার্থই এক্ষেত্রে রলফ ওয়াল্ডো এমারসনের বক্তব্য অনুমেয়- দৃঢ়চেতা মানুষ বাহ্যিক বঞ্চনায় ভেঙে পড়ে না, কারণ তাদের শান্তি ভেতর থেকে আসে। সংগতভাবেই জর্জ অরওয়েলের মতামতও এখানটায় বেশ প্রাসঙ্গিক- ভণ্ডামির সমাজে সত্য বলা বিপ্লবের মতো, তাই সত্যবাদীরা সুবিধা হারায়। 

ফেসবুকে আমাদের বসবাস। চাইলেই কি দূরে থাকা যাবে? এ প্ল্যাটফর্‌মকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। এসবে বেশি অস্থির হওয়ার সুযোগ নেই। সময় এখনই এসবে কৌশলী এবং সাবধান হওয়ার। আপনার মনন, সংস্কৃতি ও রুচির সাক্ষী হলো ফেসবুক। আপনার ফেসবুক ওয়ালে ডিলিট বাটনে চাপ দিলেই এসব মুছে ফেলা যায় না। নিজেকে বেশি চালাক ভাবার সুযোগ নেই। আসুন, ফেসবুক ব্যবহারে আরও বেশি যত্নশীল হই। আপনার ধৈর্যশীল মনোভাব, শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, প্রেম, জাতীয়তাবোধ এবং আন্তরিকতার চর্চার মাঝেই জানান দেওয়া যাবে- আমাদের মননই আমাদের প্রকাশ। 

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   ফেসবুক  মেটা  প্রযুক্তি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: