মাঠের লড়াইয়ে বিশ্বকাপের ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার পর আর্জেন্টিনা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে একের পর এক অদ্ভুত ও ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। মূলধারার গণমাধ্যমগুলো এসব গুজবকে আমলে না নিলেও, দলের নিবেদিতপ্রাণ হাজার হাজার ভক্ত হারের নেপথ্যে নানা ‘অদৃশ্য শক্তি’ ও 'চক্রান্তের' ব্যাখ্যা খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিওতে দেখা যায় ফাইনাল ম্যাচের আগে ড্রেসিংরুমের সামনে লিওনেল মেসি কিছু একটা বলছেন। আর সেই ভিডিও ঘিরেই ভক্তদের মনে তৈরি হয় ‘সেই রাতে কিছু একটা ঘটেছিল’ জল্পনা। এ নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে শেষ পর্যন্ত মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন জাতীয় দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি, ফুটবল কিংবদন্তি মারিও কেম্পেস এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। তবুও একের পর এক অবিশ্বাস্য দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে।
গোললাইনের রহস্য ও ট্র্যাকিং চিপ
অনলাইনে এক সমর্থকের দাবি, অন্যান্য ম্যাচে গোলরক্ষকদের জাল ও পোস্ট পরীক্ষা করতে দেখা গেলেও ফাইনালে তা দেখা যায়নি। তার অভিযোগ, পাউ কুবারসির পায়ে লেগে বলটি আসলে শেষ মুহূর্তে গোললাইন অতিক্রম করেছিল। সমর্থকেরা বলছেন, বলের ছায়া দেখেই নাকি বোঝা গেছে তা ভেতরে ঢুকেছিল। অনেকে আবার এক ধাপ এগিয়ে বলছেন, বলের ভেতরের ট্র্যাকিং চিপ ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ বা বাইরে থেকে হেরফের করা সম্ভব।
পরিবারের ওপর চাপ ও ড্রেসিংরুমে আতঙ্ক
আরেকটি চর্চিত অভিযোগে বলা হচ্ছে, ফাইনালের আগেই আর্জেন্টিনার ফুটবলার ও তাদের স্বজনদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল, যাতে দলটি জয়ী হতে না পারে। প্রায় সব খেলোয়াড়ের পরিবারের ওপরই নাকি মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, যার কারণে স্বজনেরা অনেকেই মাঠে উপস্থিত ছিলেন না। তবে এর পক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ মেলেনি।
একইভাবে ফাইনালের ঠিক আগমুহূর্তে ফিফার সারপ্রাইজ ডোপিং টেস্ট নিয়েও উঠছে অভিযোগ। বলা হচ্ছে, এতে খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি ব্যাঘাত ঘটে। যদিও ফিফা স্পষ্ট করেছে, এটি টুর্নামেন্টের স্বাভাবিক মেডিকেল প্রটোকলের অংশই ছিল এবং আর্জেন্টিনা দল থেকেও এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আপত্তি তোলা হয়নি।
আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও ব্রিটিশ সরকারের হাত
সবচেয়ে অদ্ভুত দাবিগুলোর একটি হলো-আর্জেন্টিনাকে হারানোর পেছনে ছিল এক বিশাল আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, স্পেনের রাজা, প্রিমিয়ার লিগ, রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ ও আতলেতিকো মাদ্রিদ জড়িত ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। সমর্থকদের মতে, সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ-সংক্রান্ত ব্যানার দেখানোর পর থেকেই বিশ্বমঞ্চের প্রভাবশালী পক্ষগুলো আর্জেন্টিনার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং সমন্বিত পরিকল্পনা সাজায়।
সামাজিক মাধ্যমে এমনও রটেছে যে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নাকি মেসিকে আগেই জানিয়ে দেন ট্রফি ছেড়ে দিতে, অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদি শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
ইনফান্তিনোর ভোট ব্যাংক ও রাজনৈতিক সমীকরণ
আরেকটি তত্ত্বে দাবি করা হয়, ফিফা নাকি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল কোনো দল টানা দুইবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারবে না। বাণিজ্যিক, সম্প্রচার স্বত্ব ও রাজনৈতিক স্বার্থে এবার উয়েফা তথা ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নের দরকার ছিল।
গুঞ্জন উঠেছে, ২০২৭ সালের ফিফা নির্বাচনে ইউরোপের সমর্থন নিশ্চিত করতে ইনফান্তিনো উয়েফার সঙ্গে গোপন চুক্তি করেন। যার বিনিময়ে স্পেনকে চ্যাম্পিয়ন করানো হয়, যাতে ইউরোপীয় দেশগুলো এবং স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের (আরএফইএফ) ভোট তাঁর ঝুলিতে পড়ে।
এফবিআই অভিযান ও বেটিং কেলেঙ্কারি
আরেক কাল্পনিক অভিযোগে বলা হয়, ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামেই এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়াকে গ্রেফতারের প্রস্তুতি নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সংস্থা এফবিআই। খেলা শুরুর কয়েক মিনিট আগে ড্রেসিংরুমে এই খবর পৌঁছালে ফুটবলারদের মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়।
এছাড়া লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর চোট, ম্যাচে আর্জেন্টিনার একটি শটও অন-টার্গেটে না থাকা এবং অতিরিক্ত রক্ষণে খেলার কারণ স্পেনের শ্রেষ্ঠত্ব নয় বরং স্পোর্টস বেটিং চক্রের সঙ্গে গোপন সমঝোতা বলে অভিযোগ তুলেছেন অনেকে।
সামরিক ঘাঁটি ও রহস্যময় শক্তি হস্তান্তরের গল্প
সবচেয়ে চমকপ্রদ দাবিগুলোর একটি হলো-বিশ্বকাপ ট্রফির বিনিময়ে স্পেন নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের রোতা ও মোরোন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, ম্যাচ চলাকালে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও সমর্থকদের 'শক্তি শুষে নেওয়া' হয়েছিল বলে দাবি করেছেন কেউ কেউ। অনেকে মাঠে অস্বাভাবিক অনুভূতি ও ক্লান্তি অনুভব করার কথা জানিয়ে একে 'কালো জাদু'র আছড় বলে অভিহিত করছেন।
এমনকি মেসি ও শিশু লামিনে ইয়ামালের বহু পুরোনো একটি গোসল করানোর ছবি টেনে এনে দাবি করা হচ্ছে, এটি ছিল বার্সেলোনা নামক ‘ফ্রিম্যাসনিক ক্লাব’ এর একটি দীক্ষা অনুষ্ঠান, যার মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ফুটবল ক্ষমতার সত্তা ইউরোপে হস্তান্তর করা হয়েছে!
কাঠগড়ায় রেফারি
সবশেষে, ম্যাচের রেফারি স্লাভকো ভিনচিচের পারফরম্যান্স ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যে, এই ম্যাচের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিশ্বকাপ ফাইনালটি পুনরায় আয়োজনের দাবিও তুলছেন অনুরাগী ভক্তরা।
সময়ের আলো/আরবিএন