দীর্ঘ ২৫ বছরের গবেষণার পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ট্রাইকোডার্মাভিত্তিক জৈব ছত্রাকনাশক উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। দেশীয় উৎসের ‘ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম’ থেকে তৈরি ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ নামের এই বায়োফরমুলেশনটি একই সঙ্গে জৈব ছত্রাকনাশক ও জৈব সার হিসেবে কাজ করবে। এটি বিভিন্ন ফসলের রোগ দমন, ফলন বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং মৎস্য খাতের পানিতে অক্সিজেনের মান বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে জানা গেছে।
গবেষক দলের প্রধান ও বাকৃবির উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল জানান, দেশে ব্যবহৃত মোট বালাইনাশকের প্রায় ৪৫-৪৬ শতাংশই রাসায়নিক ছত্রাকনাশক, যা মাটি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই বাস্তবতায় টেকসই বিকল্প হিসেবে ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণার জন্য দেশের বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা শতাধিক ট্রাইকোডার্মা থেকে সর্বাধিক কার্যকর ও জলবায়ুর সঙ্গে মানানসই প্রজাতিটি নির্বাচন করা হয়। দেশীয় উৎসের অণুজীব হওয়ায় এটি আমদানিনির্ভর বায়োপণ্যের তুলনায় সাশ্রয়ী ও অধিক কার্যকর।
মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই জৈব ছত্রাকনাশক ব্যবহারে টমেটোতে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ, আলুতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, ধানে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং চা গাছে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পায়।
এ ছাড়া টমেটো, আলু, বেগুন, মরিচ, শসা, শাকসবজি ও চা গাছের ফিউজারিয়াম উইল্ট, রুট রটসহ নানা মারাত্মক রোগ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। মরিচ ও ডালজাতীয় ফসলে বীজবাহিত রোগ ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দমন করা গেছে।
প্রযুক্তিটি ছাদকৃষি ও মৎস্য খাতেও অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বাকৃবির গবেষক অধ্যাপক ড. মো. শাহেদ রেজা জানান, মাছ চাষের পুকুরে অব্যবহৃত খাদ্য ও বর্জ্যের কারণে পানির গুণগত মান নষ্ট হয়। ছোট পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রাইকোডার্মা ব্যবহারে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন বৃদ্ধি পায় এবং ক্ষতিকর অ্যামোনিয়ার পরিমাণ হ্রাস পায়, যা মাছ উৎপাদনে লাভজনক ভূমিকা রাখবে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ভাবিত এই পণ্যটি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নিবন্ধন ও স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নিবন্ধন সম্পন্ন হলে এটি বাজারের রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার হ্রাস করে টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
সময়ের আলো/জেডি