বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় একটি খেলা উশু। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলাটির সাফল্যের হারও মন্দ নয়। তবে দেশের উশু যে আসনে থাকার কথা ছিল কাক্সিক্ষত সেই লক্ষ্যে এখনও পৌঁছেনি। রাজনীতিকরণ, দলাদলি, পরস্পরে কাদা ছোড়াছুড়ি, তহবিল তছরুপ থেকে ব্যক্তিগত চরিত্রহনন- মোদ্দকথা উশুতে খেলার চেয়ে ধুলাই ছিল বেশি। এই সমস্যা এবং সংকট দূরীকরণে বর্তমান অ্যাডহক কমিটি কাজ করবে বলে জানিয়েছেন কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রখ্যাত মার্শাল আর্ট তারকা উশু বিশেষজ্ঞ শিফু দিলদার হাসান দিলু। সময়ের আলোর সঙ্গে একান্ত আলাপনে আরও অনেক কথা বলেছেন তিনি।
সময়ের আলো : কেমন হলো উশুর নতুন অ্যাডহক কমিটি?
দিলদার হাসান : কমিটি খুবই ভালো হয়েছে। আমাদের আগের কমিটিতে স্পন্সর সংকট ছিল। স্পন্সর করার মতো সেরকম কোনো শিল্পপতি বা কোনো শিল্প উদ্যোক্তা ছিলেন না। বর্তমান কমিটিতে সেই সংকট নেই। দেশের অনেক নামকরা শিল্পপতি, উদ্যোক্তারা এবারের কমিটিতে যুক্ত হয়েছেন। বর্তমান ক্রীড়াবান্ধব সরকার, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। এই কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উনাদের প্রতি আমার অনেক অনেক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা।
সময়ের আলো : আপনি শিল্পপতি, শিল্প উদ্যোক্তাদের কথা বলছিলেন। টেকনিক্যাল, টেকটিক্যাল সাইটগুলো কেমন হলো? কমিটিতে দক্ষ উশুকা কিংবা সাবেক তারকারা কি যুক্ত হয়েছেন?
দিলদার হাসান : দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা প্রথম মিটিং করেছি, সেখানে শুভেচ্ছা বিনিময়, পরিচিতি পর্ব ছিল। প্রথম মিটিংয়ে একটি শক্তিশালী টেকনিক্যাল টিম গঠনের পরিকল্পনা করেছি। সেকেন্ড মিটিংয়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে সব টেকনিক্যাল পারসনদের এখানে নিয়ে আসব। সেই সঙ্গে আমাদের যে মূল কমিটি রয়েছে, সেখানে আমি আছি একজন টেকনিক্যাল পারসন। আপনারা জানেন আমি কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারন্যাশনাল সার্টিফিকেটধারী। দ্বিতীয় কারণ হলো যে আমাদের এখানে ইন্টারন্যাশনাল যে কয়জন জাজ আছে, তার মধ্যে দুজন জাজ এই টেকনিক্যাল কমিটিতেও আছেন। সাউথ এশিয়ান জাজও এই কমিটির মধ্যে আছে। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল তিন-চারজন কোচও এই কমিটিতে আছেন।
সময়ের আলো : উশুতে একটা বড় সমস্যা গ্রুপিং। বর্তমান কমিটি এই অচলায়তন ভাঙতে পারবে তো?
দিলদার হাসান : ২০০৭ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ উশু সমিতির যাত্রা শুরু। সেখান থেকে ২০১৮ সালে অ্যাসোসিয়েশন, পরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এটিকে ফেডারেশনের স্বীকৃতি দেয়। উশুর যাত্রালগ্ন থেকেই আমি এর সঙ্গে জড়িত। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তখন আমরা অনেকগুলো চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন করেছি। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ করেছিলাম। সাতটি দেশ এসেছিল। প্রায় ৪৮০ জন খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ওই সময় মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামে অংশ নিয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশ ৩টি স্বর্ণ, ১১টি রৌপ্য এবং ৭টি ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিল।
এরপর ২০১০ সালে এসএ গেমস হয়েছে। এখানেও আমাদের সাফল্য খুব ভালো। কিন্তু ২০১০ সালের পর রাজনৈতিক কারণে আমাকে উশু থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপরে যারা এসেছিলেন তারা না ছিলেন টেকনিক্যাল পারসন, না ছিল তাদের সেরকম অভিজ্ঞতা। উশুর ইন্টারন্যাশনাল বডির সঙ্গে লবিং করার মতো, তাদের সঙ্গে করসপন্ডেন্স করার মতো দক্ষ তারা ছিলেন না। যে কারণে উশু ফেডারেশন যে জায়গায় পৌঁছার কথা সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। আমাদের মতো ফেডারেশনগুলোতে আন্তর্জাতিক লবিংটা ভালো করে মেইনটেইন করতে হয়।
২০২৪ সালে এসে আগে সেদিকে আমরা নজর দিয়েছি এবং সে কারণে আমরা সাউথ এশিয়ান উশু ফেডারেশনের যে কমিটি হয়েছে, সেই কমিটির মধ্যে অনেকগুলো পোস্ট বাংলাদেশের পক্ষে নিয়ে এসেছি। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে আমরা বাংলাদেশে আবার সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করব, যেটা ২০০৮ সালে করেছিলাম। ২০১০ সালের পর গত ১৪-১৫ বছর যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা কিন্তু কোনো ইন্টারন্যাশনাল গেমস বাংলাদেশে আয়োজন করতে পারেনি।
সময়ের আলো : সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কোন কোন মেয়াদে আপনি দায়িত্বে ছিলেন?
দিলদার হাসান : আমি ২০০৭ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ছিলাম। এরপর গত ১৪ বছর আমাকে কমিটিতে রাখা হয়নি। ২০২৪ সালে সরকারের পটপরিবর্তনের পর আবারও আমি দায়িত্ব পেয়েছি।
সময়ের আলো : উশুকে এগিয়ে নিতে নিশ্চয়ই আপনার কিংবা আপনার কমিটির সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা আছে। সেসব বিষয়ে একটু বলবেন?
দিলদার হাসান : আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সাউথ এশিয়ান লিডারশিপে আবার চলে যাওয়া। তাতে আমাদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে। বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল গেমসের আয়োজন করা। তবে আমরা যত কিছুই করি না কেন কোনো লাভ হবে না যদি আমরা খেলোয়াড়, কোচদের আর্থিকভাবে লাভবান করতে না পারি। বর্তমান সরকার সেøাগান দিয়েছে ‘ক্রীড়া হবে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’। ক্রীড়া যদি পেশা না হয়, আমার খেলোয়াড়দের পরিবার কী করে ভরসা পাবে?
আমরা আগামী বছর ঈদের পরেই একটা উদ্যোগ নিয়েছি, উশু প্রিমিয়ার লিগ চালুর। খেলোয়াড়দের আর্থিকভাবে লাভবান করার। আমাদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে, খেলোয়াড়দের পেশাজীবী হিসেবে, মানে উশু পেশাজীবী হিসেবে তাদের তৈরি করা। কোচদের সেভাবে তৈরি করা, বিচারকদের তৈরি করা।
সময়ের আলো : গত সরকারের আমলের যোগ্য কারোর কি আপনাদের কমিটিতে কাজের সুযোগ থাকবে?
দিলদার হাসান : কে কোন রাজনৈতিক দল করে সেটা বড় কথা নয়। আমরা আগে উশুর লোক, আমরা একটা পরিবার। আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। আমাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট যিনি ছিলেন মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান খান উনার মাধ্যমে আমি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম, যেন আগের কমিটির সবাই উশু ফেডারেশনে আবার আসে। আমি গত ১৪ বছর উশু ফেডারেশনে ঢুকতে পারিনি। এমনকি আমার নামে নিষেধাজ্ঞাও ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালে আমি এসে সবাইকে উদাত্ত আহ্বান জানালাম ফেডারেশনে আসতে। তবে আসার আগে ফেডারেশনের তহবিলের সব অর্থের হিসাব তাদের দিতে হবে। বাইরে থেকে দোষারোপ, কাদা ছোড়াছুড়ি, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন এসব বন্ধ করতে হবে। কথা বলতে হবে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। বায়বীয়ভাবে দোষ দিলে হবে না।
সময়ের আলো : আপনি হিসাব-নিকাশের কথা বললেন। আগের কমিটি কি তহবিল তছরুপ করেছে?
দিলদার হাসান : আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেডারেশনের অ্যাকাউন্টে মাত্র পাঁচশ টাকা পেয়েছি। কোনো টাকা ছিল না। প্লাস ফেডারেশনে কোনো মালামাল ছিল না। বসার জন্য একটা টেবিল, একটা চেয়ার, একটা প্রিন্টার ছিল সেটাও নষ্ট। নোংরা পরিবেশ ছিল, গোডাউন বানিয়ে রেখেছিল তারা। এটাকে পরিষ্কার করতেই ১৫ হাজার টাকা লেগেছে। এখন আমরা একটা সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করছি।
সময়ের আলো : দায়িত্ব গ্রহণের আগে কিংবা পরে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কি না?
দিলদার হাসান : আমাদের একটা কথাই তারা বলেছেন, আপনারা কাজ করে যান, ট্রেনিংয়ের প্রতি জোর দেন। প্লেয়ারদের ট্রেনিংয়ের প্রতি জোর দেন, খেলোয়াড়দের প্রতি জোর দেন, কোচদের প্রতি জোর দেন। আমরা যেন দেশ-বিদেশ থেকে সাফল্য বয়ে আনতে সেদিকে নজর দিতে বলা হয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে