চট্টগ্রামের নবগঠিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার সদর দফতর ভূজপুরে রাখার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ছয় ইউনিয়নে ত্রিমুখী উত্তেজনা বিরাজ করছে। দফতর পুননির্ধারণের দাবিতে উত্তরের বাগানবাজার, দাঁতমারা ও নারায়ণহাটে সর্বাত্মক হরতাল পালন করছে। আবার সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে ভূজপুরে আনন্দ মিছিল এবং দফতরের অবস্থান নিয়ে চরম ক্ষোভ জানিয়েছেন দক্ষিণে সুয়াবিলের বাসিন্দারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি গেজেটে সদর দফতর পশ্চিম ভূজপুর মৌজায় নির্ধারণের পর থেকেই তিন ইউনিয়নের বাসিন্দারা সিদ্ধান্তটিকে ভৌগোলিকভাবে অযৌক্তিক দাবি করে আসছেন। তাদের অভিযোগ, বর্তমান অবস্থানে সদর দফতর থাকলে উপজেলার একটি বড় অংশের মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেবা নিতে হবে। বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবিতে ইতোমধ্যে একাধিক দফা হরতাল, মহাসড়ক অবরোধ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা বাস্তবায়ন সমন্বয় পরিষদের সমন্বয়কারী যুবদল নেতা নুরুল আমিন আজাদ বলেন, প্রশাসনিক কাজের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য করা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও যাতায়াত সুবিধা বিবেচনায় অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে যৌক্তিক স্থানে সদর দফতর করতেই হবে। আমাদের ৪৮ ঘণ্টার চলমান হরতাল কর্মসূচীকে সম্মান দিয়ে সরকার ব্যবস্থা নিলেই আমরা ঘরে ফিরবো।
অন্যদিকে, সরকারি সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় ভূজপুর ইউনিয়নে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। রোববার (২৬ জুলাই) বিকেলে ভূজপুর ন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠ থেকে আনন্দ মিছিল বের করা হয়। এতে ভূজপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এ এইচ এম শাহজাহান চৌধুরী শিপন, হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরীসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা অংশ নেন।
হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসে চৌধুরী বলেন, আজকের কর্মসূচীর মাধ্যমে আমরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। গেজেটে যেখানে সদর দফতর সেখানেই সবার তৃপ্তি। সে কারণে আমরা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দলমত সবার সহযোগিতা চাই। একটি পক্ষ সরকারকে বিব্রত করতেই মূলত হরতাল কর্মসূচী দিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এতে জনভোগান্তির ফলে আন্দোলনকারীরা এখন জনবিচ্ছিন্ন হয়েছেন।
অপরদিকে, নবগঠিত উপজেলার দক্ষিণের সুয়াবিল ইউনিয়নের বাসিন্দারা ফটিকছড়ি উপজেলায় থাকতে চান। তারা ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলায় যেতে মোটেই নারাজ। ফলে শুরু থেকেই তারা উত্তর উপজেলার বিরোধিতা করে আসছেন। তাদের দাবি, প্রশাসনিক সেবা গ্রহণে সুয়াবিলের মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। এ কারণে তারা ইতোমধ্যে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন।
সুয়াবিলের বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য প্রফেসর মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, জনমত ছাড়াই সুয়াবিলকে প্রস্তাবিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত জনস্বার্থবিরোধী ও অযৌক্তিক। সুয়াবিল থেকে বর্তমান উপজেলা সদর মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে, কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা সদর ১৫ কিলোমিটার দূরে। এতে মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নতুন উপজেলা গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের দোরগোড়ায় প্রশাসনিক সেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সদর দফতরের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধ সেই উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। দ্রুত অংশীজনদের মতামত ও বাস্তব যোগাযোগব্যবস্থা বিবেচনায় সমাধানের উদ্যোগই সমাধানের পথ খুলবে।
সরকার জাতীয় বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয়-সংক্রান্ত কমিটির (নিকার) সভায় অনুমোদনে ৮ জুলাই প্রকাশিত সরকারি গেজেটে বাগানবাজার, দাঁতমারা, নারায়ণহাট, ভূজপুর, হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিল ইউনিয়ন নিয়ে ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা গঠন হয়। তবে সদর দফতরের অবস্থান নিয়ে বিরোধ চলছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও ক্ষোভের বিষয়টি আমরা সরকারের ঊর্ধ্বতনদের জানিয়েছি। তাদের সিদ্ধান্তেই পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
সময়ের আলো/আতা