চট্টগ্রামজুড়ে ভয়াবহ রূপে ফিরছে ডেঙ্গু

সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম

সারাদেশ

চট্টগ্রামে ভয়ংকর হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত ডেঙ্গু মশার বিস্তার ঘটাচ্ছে দ্রুত। বছরের শুরু থেকে আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগীর

2026-09-18T23:10:15+00:00
2026-09-18T23:10:15+00:00
 
  শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
চট্টগ্রামজুড়ে ভয়াবহ রূপে ফিরছে ডেঙ্গু
সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১০ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রামে ভয়ংকর হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত ডেঙ্গু মশার বিস্তার ঘটাচ্ছে দ্রুত। বছরের শুরু থেকে আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয় ছিল আলোচনায়। মৃত্যু তেমন ছিল না। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে আক্রান্তের সঙ্গে মৃত্যুর হারও বাড়ছে। ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ঠেকাতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়। চট্টগ্রাম নগরীর হটস্পটগুলোতে লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি শুরু করা হয়েছে মাইকিং। লিফলেট শেষ হয়ে যাওয়ায় আরও ৫০ হাজার ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোববার নতুন ছাপানো লিফলেট সিভিল সার্জনের দফতরে পৌঁছাবে। এসব লিফলেট হটস্পট ছাড়াও বিভিন্ন হাসপাতালের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে দেওয়া হচ্ছে।

শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। মারা গেছেন ১৪ জন। এর মধ্যে ১২ জনই নারী। সেপ্টেম্বরের এই সময় পর্যন্ত মৃত্যু ও আক্রান্ত ছিল সবচেয়ে বেশি। গর্ভবর্তী নারী, শিশু থেকে সব ধরনের রোগীই আছে মৃত্যুর তালিকায়। গেল আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে মোট আক্রান্ত ছিল ২ হাজার ৩৬ জন। আর সেপ্টেম্বরের ১৮ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১২শ ছাড়িয়েছে। মোট আক্রান্ত ৩ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, সেপ্টেম্বরের মৃত্যু এবং আক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার সম্ভাবনা নেই। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভয়ংকর অক্টোবর অপেক্ষা করছে। অর্থাৎ আগামী মাসে রেকর্ড আক্রান্ত ও মৃত্যু হতে পারে। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর জনসংখ্যা এখন ৭০ লাখ ছুঁই ছুঁই। নগরীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে স্বাস্থ্যসেবা বাড়েনি। আবর্জনা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনও আগের মতোই। নাগরিক সচেতনতা বলতে তেমন কিছুই নেই। ডাবের খোসা, টায়ার, প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতিটি অলিগলিতেই পড়ে আছে। বাসাবাড়িতে জমে থাকা পানি পরিচ্ছন্ন করা তেমন হয় না। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) চলমান পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম খুব বেশি প্রভাব ফেলছে না। নগরীর ঘনবসতি এলাকায় নামেমাত্র চলে পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম। সব মিলে ডেঙ্গু ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে রাখার কোনো পরিবেশ এখনও গড়ে ওঠেনি। এসব কারণে এক বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে থাকলে পরের বছর ভয়াবহ আকার ধারণ করে। নিয়ন্ত্রণ এবং ভয়াবহ রূপ নেওয়া দুটোই এখন প্রকৃতির ওপর নির্ভর। 

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, চট্টগ্রাম নগরীর পাশাপাশি মফস্বল এলাকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়মিত আপডেট করা হচ্ছে। আক্রান্ত এবং মৃত্যুর পরিসংখ্যানও নেওয়া হয়। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নজরদারির বাইরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য তেমন নেই। শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে। আর এ সময় চট্টগ্রাম বিভাগের আট জেলায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। দৈনিক গড় আক্রান্তের হার ৭০ জনের বেশি। কোনোদিন আক্রান্ত সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে যায়। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি সব হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে রোগী। সবখানেই রোগীর চাপে হিমশিম দশা। গুরুতর রোগীরা আইসিইউ বেড সংকটে ভুগছেন। ব্যয়বহুল চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন অনেকে।


ডেঙ্গু রোগী সবচেয়ে বেশি ভর্তি হচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। প্রতিদিন গড় হিসাবে সেখানে ২৫ থেকে ৩০ জন চিকিৎসা নেন। এরপর ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতাল, আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম সিএমএইচ হাসপাতাল, বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালসহ ছোট বড় বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে রোগী ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। 

এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। এর মধ্যে সীতাকুণ্ড উপজেলায় আক্রান্ত ও মৃত্যু দুটোই বেশি। আক্রান্ত মৃত্যুর হারে পরের অবস্থানে নগরীর সঙ্গে লাগোয়া কর্ণফুলী উপজেলা। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নির্দেশে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে পাঁচটি বেড সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি সময়ের আলোকে বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সেপ্টেম্বরে বেড়েছে। আগামী অক্টোবরে আরও বৃদ্ধির শঙ্কা করছি। ডেঙ্গুর প্রকোপ ঠেকাতে আমরা লোকজনের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছি। চট্টগ্রাম নগরীর হটস্পটগুলোতে মাইকিং করা হচ্ছে নিয়মিত। সেখানে দেওয়া হচ্ছে লিফলেট। বিতরণের জন্য ছাপা লিফলেট শেষ হয়ে যাওয়ায় আরও ৫০ হাজার ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোববার এসব লিফলেট হাতে পাব। লিফলেটগুলো হটস্পট ছাড়াও হাসপাতালের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সরবরাহ করা হচ্ছে। 

জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুর প্রবণতা হঠাৎ বৃদ্ধির অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। প্রকোপ বাড়ার পেছনে আবহাওয়া একটি বড় ফ্যাক্টর। প্রায় প্রতিদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানিতে ব্যাপক হারে জন্ম নিচ্ছে এডিস মশা। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এই প্রকোপ ঠেকাতে পারে। পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। 


বড় ভয় ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে : ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য আতঙ্কের নাম ‘শক সিনড্রোম’। চিকিৎসকদের মতে ডেঙ্গু জ্বরের একটি গুরুতর ও প্রাণঘাতী অবস্থাকে বোঝায় শক সিনড্রোম। এই অবস্থায় রোগীর জ্বর কমার সময় বা রোগ শুরুর তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে রক্তনালি থেকে অতিরিক্ত প্লাজমা বা তরল পদার্থ বের হয়। এতে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, ত্বক শীতল ও স্যাঁতসেঁতে হওয়া, প্রচণ্ড পেটব্যথা, অনবরত বমি, মাড়ি বা ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অবসাদ ও অস্থিরতা দেখা দেয়। এসব ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের অন্যতম লক্ষণ। এ সময় রোগীর রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এই লক্ষণগুলো দেখা মাত্রই রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। শিরায় স্যালাইন বা ফ্লুইড থেরাপির মাধ্যমে শরীরের রক্তের পরিমাণ ও চাপ স্বাভাবিক রাখতে হয়। অন্যথায় রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। 

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে ঝুঁকি বেশি থাকে। এসব লক্ষণের রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি। গুরুতর রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিভাগে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১২ জনই নারী। সচেতনতা অভাব দ্রুত চিকিৎসা না নেওয়া বা হাসপাতালে ভর্তি না করার জন্য দেখা গেছে বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ডেডিকেটেড হাসপাতাল নেই : দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রাম। ঢাকার পরেই চট্টগ্রামের অবস্থান। ঢাকায় ডেঙ্গু রোগীর জন্য একাধিক ডেডিকেটেড হাসপাতাল আছে। কিন্তু চট্টগ্রামে একটি ডেডিকেটেড হাসপাতালও নেই। চসিকের সদরঘাট এলাকার মেমন হাসপাতাল এবং আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল, সীতাকুণ্ডে বিআইটিআইডি ডেঙ্গু চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা থাকার কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে সেখানে চিকিৎসা সেবা খুব উন্নত নয় বলে মনে করেন রোগীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেবিন বা বিশেষায়িত হাসপাতালের অভাব নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। চট্টগ্রামে বেসরকারি এক হাসপাতালের বিরুদ্ধে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগী মৃত্যুর পর দুদিনে তিন লাখ টাকা বিল দাবির অভিযোগ উঠেছে। 

ক্যাপ্টেন আতিক ইউএ খান বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফেসবুক পোস্টে চট্টগ্রামে ভালো কেবিন এবং হাসপাতালের করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি লেখেন— চট্টগ্রামে মহামারি চলছে। ডেঙ্গু, হাম, টাইফয়েড চিকিৎসায় ভালো হাসপাতালগুলোতে কেবিন নেই। এক কলিগের মায়ের জন্য মেডিকেল জোনে একটা কেবিন খুঁজে পেলাম ডিরেক্টরদের মাধ্যমে। নগরীর পার্কভিউ, মেডিকেল সেন্টার, ন্যাশনাল হাসপাতালে কেবিন পাইনি। চট্টগ্রামে প্রচুর উন্নতমানের হাসপাতাল হওয়া দরকার। চট্টগ্রামের হেলথ কেয়ার ইনস্টিটিউটগুলো রোগীর চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। 


এ ব্যাপারে ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, চট্টগ্রামে ডেডিকেটেড হাসপাতাল নেই। তবে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের পাশাপাশি নগরী ও উপজেলার হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা আছে। পর্যাপ্ত কিট মজুদ আছে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য। এসব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর জন্য পৃথক বেড ও ওয়ার্ড আছে।

মারা যাওয়া ১৮ জনের মধ্যে নারী বেশি : চট্টগ্রাম বিভাগের আট জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার পর্যন্ত মোট ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জনই নারী। সংখ্যার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১ থেকে ৫ বছর বয়সি মারা যাওয়া ২ জনের মধ্যে একজন ছেলে শিশু আরেকজন মেয়ে শিশু। ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে মারা গেছে এক ছেলে শিশু, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। এর মধ্যে একজন পুরুষ তিনজন নারী। মারা যাওয়া ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সের ২ জনের মধ্যে একজন পুরুষ একজন নারী, ৪৪ থেকে ৫০ বছরের তিনজনের মধ্যে একজন পুরুষ তিনজন নারী, ৫১ থেকে ৫৫ বছরের ২ জনের মধ্যে একজন পুরুষ একজন নারী, ৫৬ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে একজনের মধ্যে একজনই নারী, ৭০ থেকে ৭৫ বছরের একজনের মধ্যে একজনই নারী রোগী।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   চট্টগ্রাম  ভয়াবহ  ডেঙ্গু  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: