ভাঙা পায়ে ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না হালেখা খাতুন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। তবু থেমে নেই তার জীবনসংগ্রাম। নিজের চিকিৎসার সামর্থ্য নেই, ঘরে খাবার নেই, মাথার ওপর নেই নিরাপদ ছাউনি। তার ওপর প্রায় দুই বছর ধরে শয্যাশায়ী ৮৫ বছর বয়সি স্বামী রুস্তম। স্বামীকে দেখাশোনার পাশাপাশি দুমুঠো খাবারের জোগান দিতে প্রতিদিন গাছের শুকনো ডাল, খরকুটো ও লাকড়ি সংগ্রহ করে বিক্রি করেন হালেখা।
গত বৈশাখ মাসে কালবৈশাখীতে তাদের ঘরের অর্ধেক টিনের চাল উড়ে যায়। এরপর কেটে গেছে প্রায় পাঁচ মাস। কিন্তু নতুন করে চাল দেওয়ার সামর্থ্য হয়নি আজও। বৃষ্টি নামলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। তখন অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে পাশের একটি দোকানের বারান্দায় আশ্রয় নিতে হয় এই বৃদ্ধাকে। বৃষ্টিভেজা মেঝে, ঠান্ডা বাতাস আর পোকামাকড়ের ভয় নিয়েই কাটে তাদের দিন রাত।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ গাজীপুর গ্রামের জাবেদ আলী মোড় এলাকায় একটি ছোট জীর্ণ ঘরে বসবাস হালেখা ও রুস্তম দম্পতির। মাত্র ১০ ফুট লম্বা ও ৮ ফুট চওড়া ঘরটির অর্ধেক চাল এখন নেই। চারদিকে জীর্ণ টিনের বেড়া। নেই নিরাপদ থাকার মতো পরিবেশ।
হালেখা জানান, তাদের নিজেদের কোনো জায়গা-জমি নেই। ভাই মানবিক বিবেচনায় কয়েক ফুট জায়গা দেওয়ায় সেখানে পুরোনো টিন সংগ্রহ করে ছোট একটি ছাপড়া ঘর তৈরি করেছিলেন। সেই ঘরটিই ছিল তাদের একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু ঝড়ে ঘরের চাল উড়ে যাওয়ার পর সেই আশ্রয়ও যেন অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
প্রায় ১০ বছর ধরে কোনো কাজ করতে পারেন না রুস্তম। হাঁপানি, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন তিনি। প্রায় দুই বছর ধরে শয্যাশায়ী। স্বামীকে দেখাশোনার পাশাপাশি সংসারের খরচ চালাতে একসময় দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিকের কাজ করতেন হালেখা।
কিন্তু প্রায় দুই বছর আগে গরুর দড়িতে পা পেঁচিয়ে পড়ে গিয়ে তার একটি পা ভেঙে যায়। অর্থের অভাবে যথাযথ চিকিৎসা করাতে পারেননি। ফলে সেই ভাঙা পা নিয়েই এখনও কষ্ট করে চলাফেরা করতে হয় তাকে।
বর্তমানে প্রতিদিন শুকনো ডাল, খরকুটো ও লাকড়ি সংগ্রহ করে স্থানীয় চায়ের দোকান কিংবা প্রতিবেশীর কাছে বিক্রি করেন হালেখা। দিন শেষে আয় হয় মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই কোনো দিন তিন বেলা, আবার কোনো দিন এক বেলা খাবার জোটে তাদের।
কথা বলার সময় দীর্ঘদিনের কষ্ট যেন চোখেমুখে ফুটে ওঠে হালেখার। তিনি বলেন, জন্মের পর থেইকাই দুঃখ-কষ্টে জীবন গেল। সুখ কী জিনিস, তা কপালে লইয়া আসি নাই। স্বামীর ওষুধ কিনে দিতে না পারা কিংবা কখনো না খেয়ে থাকার কষ্টের চেয়েও তার কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে বৃষ্টির সময় মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকা।
শয্যাশায়ী রুস্তম বলেন, আমি আর কাজ করতে পারি না। আমারে এখন আমার বউও টানতে পারে না। আমরা শুধু পরকালের ডাকের অপেক্ষায় আছি। এই দম্পতির এক ছেলে রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থাও ভালো নয়। অন্যের রিকশা ভাড়া চালিয়ে নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয় তাকে। ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য আলাদাভাবে প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা তার পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান রুস্তম।
গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মাহবুব আলম বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/আতা